চিনের KJ-3000 ‘ফ্লাইং রাডার’, স্টেলথ বিমান শনাক্তে কতটা সক্ষম? - 24 Ghanta Bangla News
Home

চিনের KJ-3000 ‘ফ্লাইং রাডার’, স্টেলথ বিমান শনাক্তে কতটা সক্ষম?

Spread the love

বেজিং: সামরিক নজরদারি ও আকাশপথে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পথে আরও এক ধাপ এগোল চিন। স্যাটেলাইট চিত্রে দেশটির নতুন KJ-3000 Airborne Early Warning and Control (AEW&C) বিমানের চারটি দেখা গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শিয়ান-ইয়ানলিয়াং এলাকায় Xi’an Aircraft Company-র উৎপাদন পরিকাঠামোর কাছে এই বিমানগুলি দেখা যাওয়ায় প্রকল্পটি ধারাবাহিক উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উৎপাদনের বর্তমান অবস্থা এবং বিমানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে সব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়।

Y-20B কৌশলগত পরিবহণ বিমানের ভিত্তিতে তৈরি KJ-3000-এ চিনের নিজস্ব WS-20 টার্বোফ্যান ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বড় আকারের এই জেটচালিত বিমানকে চিনের আকাশপথে নজরদারি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর লক্ষ্য শুধু শত্রুপক্ষের বিমান শনাক্ত করা নয়, বরং আকাশে অবস্থান করে বিভিন্ন সেনা ইউনিটের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান এবং সামরিক অভিযানের সমন্বয় করাও।

KJ-3000 কেন গুরুত্বপূর্ণ?

AEW&C বিমান সাধারণত উঁচুতে উড়ে শক্তিশালী রাডারের সাহায্যে বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশপথ পর্যবেক্ষণ করে। স্থলভিত্তিক রাডার পাহাড়, ভূপ্রকৃতি এবং পৃথিবীর বক্রতার কারণে নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে দেরি করতে পারে। আকাশে অবস্থানরত নজরদারি বিমান সেই সীমাবদ্ধতার কিছুটা মোকাবিলা করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, KJ-3000 আকারে চিনের KJ-500-এর তুলনায় অনেক বড়। বড় এয়ারফ্রেম, জেট ইঞ্জিন এবং উন্নত সেন্সর ব্যবস্থা থাকার কারণে এর গতি, উড়ানের পাল্লা, দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার ক্ষমতা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা বেশি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

KJ-3000-এর আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হল এর উন্নত কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা। এই ধরনের বিমানে সংগৃহীত তথ্য যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সামরিক ইউনিটের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। ফলে সরাসরি লড়াইয়ে অংশ না নিয়েও বিমানটি সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে।

স্টেলথ বিমান শনাক্তে কতটা কার্যকর হতে পারে?

KJ-3000-কে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে স্টেলথ যুদ্ধবিমান শনাক্ত করার সম্ভাব্য ক্ষমতা নিয়ে। স্টেলথ প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হল শত্রুর রাডারে বিমানের উপস্থিতি শনাক্ত করা কঠিন করে তোলা। তবে স্টেলথ মানে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়। রাডারের ধরন, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান, দূরত্ব, উচ্চতা এবং পরিবেশগত পরিস্থিতির উপর শনাক্তকরণের সম্ভাবনা নির্ভর করে।

সরবরাহ করা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, KJ-3000-এর বড় সেন্সর ব্যবস্থা, উন্নত ডিজিটাল রাডার প্রযুক্তি এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা কম দৃশ্যমান লক্ষ্য শনাক্ত ও অনুসরণে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে চিনের J-20 এবং J-35-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পরিচালনায় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

তবে KJ-3000 বাস্তবে কত দূর থেকে কোন ধরনের স্টেলথ বিমান শনাক্ত করতে পারে, তার নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল বা বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রতিবেদনে নেই। তাই একে স্টেলথ বিমানের বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবে কার্যকর বলে ঘোষণা করা যায় না।

রাডার ব্যবস্থায় কী পরিবর্তনের দাবি?

প্রচলিত AEW&C বিমানে বিভিন্ন ধরনের রাডার বিন্যাস দেখা যায়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, KJ-3000-এ উন্নত ডিজিটাল অ্যারে-ভিত্তিক রাডার স্থাপত্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা ৩৬০ ডিগ্রি এলাকায় নজরদারি এবং নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে রাডারের শক্তি কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ দিতে পারে।

এতে AESA বা Active Electronically Scanned Array প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিতে অ্যান্টেনার যান্ত্রিক ঘূর্ণনের উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ইলেকট্রনিকভাবে রাডার বিমের দিক পরিবর্তন করা যায়। ফলে দ্রুত বিভিন্ন লক্ষ্য অনুসরণ এবং একাধিক দিক পর্যবেক্ষণে সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

তবে KJ-3000-এর রাডার বিন্যাস সম্পর্কে প্রতিবেদনে কিছু প্রযুক্তিগত দাবি করা হলেও তার সম্পূর্ণ নকশা, পরীক্ষিত কার্যক্ষমতা এবং সুনির্দিষ্ট শনাক্তকরণ সীমা প্রকাশ করা হয়নি। তাই এগুলিকে নিশ্চিত প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তে প্রতিবেদনে উল্লিখিত দাবি হিসেবে দেখা উচিত।

KJ-500 ও KJ-700-এর সঙ্গে পার্থক্য

চিনের আকাশপথে নজরদারি ব্যবস্থায় বিভিন্ন আকারের বিমান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। KJ-500 মাঝারি আকারের একটি AEW&C বিমান, যা তুলনামূলক ছোট এয়ারফ্রেমে নজরদারি ও তথ্য সমন্বয়ের কাজ করে। অন্যদিকে, KJ-3000-এর বড় আকার দীর্ঘ সময় আকাশে থাকা, বেশি সরঞ্জাম বহন এবং উন্নত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া চিন KJ-700 নামের আরেকটি নজরদারি বিমানও উন্নয়ন করছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে রাডারের পাশাপাশি ইলেকট্রো-অপটিক্যাল এবং ইনফ্রারেড সেন্সর ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তুলনামূলক ছোট টার্বোপ্রপ বিমানগুলি বিভিন্ন ধরনের বিমানঘাঁটি থেকে পরিচালনা করা সহজ হতে পারে, আর KJ-3000-এর মতো বড় জেটচালিত বিমান দীর্ঘ পাল্লার মিশনে বেশি উপযোগী হতে পারে।

আমেরিকার E-3 Sentry-র পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা

চিনের AEW&C বিমান কর্মসূচির সঙ্গে আমেরিকার পুরনো E-3 Sentry প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনারও তুলনা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। মার্কিন বিমানবাহিনী পুরনো E-3-এর পরিবর্তে তুলনামূলক হালকা E-7 বিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। প্রতিবেদনের দাবি, KJ-3000-এর মতো বড় প্ল্যাটফর্ম চিনকে দীর্ঘ পাল্লার নজরদারি ও বেশি সরঞ্জাম বহনের ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে।

তবে শুধু বিমানের আকার বা রাডারের সম্ভাব্য শক্তি দিয়ে দুটি দেশের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার তুলনা করা যায় না। সেন্সরের বাস্তব কার্যক্ষমতা, তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

চিনের আকাশপথে নজরদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ

KJ-3000-এর উৎপাদন নিয়ে প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রের দাবি সত্য হলে, এটি চিনের বৃহত্তর আকাশপথে নজরদারি কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে। KJ-500-এর মতো মাঝারি আকারের বিমান এবং KJ-3000-এর মতো বড় প্ল্যাটফর্ম একসঙ্গে ব্যবহার করলে বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে নজরদারি ও তথ্য সমন্বয়ের সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে KJ-3000-এর প্রকৃত উৎপাদনের হার, সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য এবং স্টেলথ লক্ষ্য শনাক্ত করার পরীক্ষিত ক্ষমতা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। আপাতত এই বিমানকে চিনের সামরিক নজরদারি পরিকাঠামোর সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু এর সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রকাশ্য তথ্য এখনও সীমিত।

Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট।  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *