তাইওয়ানকে ঘিরে চিনকে রুখতে নতুন রণকৌশল আমেরিকার
ওয়াশিংটন: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের সামরিক শক্তির মোকাবিলা (Taiwan China Conflict) এবং সম্ভাব্য সংঘাতের পরিস্থিতিতে তাইওয়ানকে সহায়তা করার জন্য নতুন রণকৌশল তৈরি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এই কৌশলে দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ড্রোন মোকাবিলা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সামরিক রসদ সরবরাহ অব্যাহত রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামরিক সংবাদমাধ্যম মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরের মার্কিন সেনাবাহিনীর অপারেশনাল নির্দেশিকায় সম্ভাব্য চিন-মার্কিন সংঘাতের বিভিন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
এই নির্দেশিকায় তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের একটি কাল্পনিক পরিস্থিতিও বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে ফিলিপিন্সের উত্তরাঞ্চলীয় লুজন থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীর দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তার উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক পরিকল্পনার অংশ, বাস্তবে অভিযান চালানোর কোনও ঘোষণা নয়।
প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলে দূরপাল্লার হামলার প্রস্তুতি
মার্কিন সেনাবাহিনীর নতুন কৌশলে প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের মধ্যে দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের এই কৌশলগত অঞ্চলে জাপান, তাইওয়ান এবং ফিলিপিন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও দ্বীপ রয়েছে।
নির্দেশিকায় প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সমুদ্রপথে থাকা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য পর্যাপ্ত পাল্লা ও গোলাবারুদের জোগান নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিনের অ্যান্টি-অ্যাকসেস অ্যান্ড এরিয়া ডিনায়াল বা এ২/এডি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
এ২/এডি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল, কোনও প্রতিপক্ষের বাহিনীকে নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রবেশ করা বা সেখানে স্বাধীনভাবে অভিযান চালানো থেকে বাধা দেওয়া। এই ধরনের প্রতিরক্ষা ভেদ করে অভিযান চালাতে হলে দূরপাল্লার অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে ঘাঁটি রক্ষার পরিকল্পনা
নতুন নির্দেশিকায় শুধু আক্রমণাত্মক সক্ষমতা নয়, মার্কিন সেনা এবং সামরিক ঘাঁটিগুলির সুরক্ষার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সংঘাতের সময় ক্ষেপণাস্ত্র, একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন এবং অন্যান্য দূরপাল্লার অস্ত্র থেকে ঘাঁটিগুলিকে রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উন্নত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং আরও সুরক্ষিত সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সেনা, অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামকে এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না রেখে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে কোনও একটি ঘাঁটিতে বড় আকারের হামলা হলেও সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কমানো সম্ভব হতে পারে।
এ ছাড়া সামরিক রসদ সংরক্ষণের কেন্দ্র, সেনা মোতায়েনের পরিকাঠামো এবং দূরপাল্লার অভিযান পরিচালনার ঘাঁটিগুলিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অন্তর্ঘাত ও সাইবার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেও রসদ সরবরাহ চালু রাখার পরিকল্পনা
দীর্ঘ সময় ধরে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জামের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্ভাব্য সংঘাতের সময় সমুদ্রপথ, বিমানপথ কিংবা স্থলপথে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীভূত রসদকেন্দ্র, বিকল্প পরিবহণপথ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার উপর জোর দিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনীর নির্দেশিকা। যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি উৎপাদন ও মেরামতের সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি করার জন্য দূরের সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগী দেশগুলির সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেনা ও সরঞ্জাম দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সামরিক ঘাঁটি, বন্দর, বিমানঘাঁটি এবং আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাইওয়ানকে ঘিরে কেন বাড়ছে চিন-মার্কিন উত্তেজনা?
তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চিন। বেজিং দ্বীপটির উপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি বজায় রেখেছে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। অন্যদিকে, স্বশাসিত তাইওয়ান চিনের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করছে।
তাইওয়ানের আশপাশে চিনের সামরিক বিমান ও নৌবাহিনীর কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আমেরিকা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এবং তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ করে। তবে যে কোনও সম্ভাব্য সংঘাতে সরাসরি মার্কিন সেনা হস্তক্ষেপ করবে, এমন নিঃশর্ত প্রকাশ্য নিশ্চয়তা ওয়াশিংটন দেয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর মার্কিন বিদেশ দফতর তাইওয়ানের কাছে চিনের সামুদ্রিক কার্যকলাপকে ‘গভীরভাবে অস্থিতিশীল’ বলে বর্ণনা করেছিল। তাইপেইর উদ্বেগ ছিল, চিনের জাহাজের কার্যকলাপ সম্ভাব্য অবরোধের প্রস্তুতির অংশ হতে পারে। তবে এই কার্যকলাপকে বাস্তব অবরোধের প্রস্তুতি হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
ইন্দো-প্যাসিফিকে কী প্রভাব পড়তে পারে?
মার্কিন সেনাবাহিনীর এই নির্দেশিকা থেকে বোঝা যায়, সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রের শক্তি নয়, ঘাঁটির নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। চিনের সামরিক তৎপরতা এবং তাইওয়ানকে ঘিরে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে এই পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসায় ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা আরও বাড়তে পারে।
তবে নির্দেশিকায় সম্ভাব্য অভিযান ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার উল্লেখ থাকলেই যে চিনের সঙ্গে যুদ্ধ আসন্ন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। বাস্তবে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে চিন, তাইওয়ান, আমেরিকা এবং আঞ্চলিক দেশগুলির সামরিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।