AMCA-তে দেরি হলে বিকল্প যুদ্ধবিমান, ১১৪ রাফাল নিয়েও বার্তা বায়ুসেনা প্রধানের
নয়াদিল্লি: AMCA বা অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট প্রকল্পে দেরি হলে বিকল্প যুদ্ধবিমান প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাতে হতে পারে ভারতীয় বায়ুসেনাকে। এয়ার ফোর্স ডে-র প্রাক্কালে বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং জানিয়েছেন, দেশের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির কর্মসূচিতে বিলম্ব হলে অন্য বিকল্প নিয়ে ভাবতে হতে পারে। একই সঙ্গে বায়ুসেনার ফাইটার স্কোয়াড্রনের ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর ৩৬ থেকে ৪০টি যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
৪২টির জায়গায় রয়েছে ২৯টি ফাইটার স্কোয়াড্রন
বর্তমানে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে ২৯টি ফাইটার স্কোয়াড্রন রয়েছে। অথচ অনুমোদিত সংখ্যা ৪২টি। অর্থাৎ অনুমোদিত শক্তির তুলনায় বায়ুসেনার ফাইটার স্কোয়াড্রনে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
এপি সিং জানিয়েছেন, এই ঘাটতি পূরণ করতে প্রতি বছর ৩৬ থেকে ৪০টি যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এএমসিএ-সহ একাধিক যুদ্ধবিমান প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী দিনে এই ঘাটতি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বায়ুসেনা প্রধানের বক্তব্য, এএমসিএ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে দেরি হলে অন্য যুদ্ধবিমান প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাতে হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্যে দেশীয় পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পের পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থার সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।
রাশিয়ার এসইউ-৫৭ নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি
বিকল্প পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এপি সিং জানিয়েছেন, রাশিয়া ভারতকে এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি ভারতীয় বায়ুসেনা।
রাশিয়া প্রকাশ্যে ভারতকে এসইউ-৫৭-এর প্রস্তাব দিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতে এই যুদ্ধবিমান যৌথভাবে উৎপাদনের প্রস্তাবও দিয়েছেন।
তবে বায়ুসেনা প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার এই প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছয়নি। ফলে এসইউ-৫৭-কে ভারতের ভবিষ্যৎ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
১১৪ রাফাল কেনার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে
ফাইটার স্কোয়াড্রনের ঘাটতি পূরণে প্রস্তাবিত মাল্টিরোল ফাইটার বিমান কেনার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বায়ুসেনা প্রধান। ভারত ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে। প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ ইতিমধ্যেই এই কেনাকাটার জন্য অ্যাকসেপ্টেন্স অব নেসেসিটি বা প্রয়োজনীয়তার অনুমোদন দিয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকাংশ রাফাল ভারতে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। মোট ১১৪টি বিমানের মধ্যে প্রায় ৯০টি ভারতে তৈরি হতে পারে। বাকি বিমানগুলি ফ্লাই-অ্যাওয়ে অবস্থায় সরবরাহ করার প্রস্তাব রয়েছে।
ভারত ইতিমধ্যেই ১১৪টি বিমানের জন্য অনুরোধ চূড়ান্ত করেছে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরের শেষের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এপি সিং জানিয়েছেন, চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়টি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভর করবে।
এএমসিএ ভারতের পঞ্চম প্রজন্মের মূল প্রকল্প
এএমসিএকে ভারতের ভবিষ্যৎ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে এই যুদ্ধবিমান তৈরি করার লক্ষ্য নিয়েই প্রকল্পটি এগোচ্ছে।
এএমসিএ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি এবং পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করবে। তবে প্রকল্পের সময়সূচি নিয়ে চাপ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই এপি সিং জানিয়েছেন, দেরি হলে বিকল্প যুদ্ধবিমান প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাতে হতে পারে।
অর্থাৎ বায়ুসেনার সামনে একই সঙ্গে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে দেশীয় এএমসিএ প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে ফাইটার স্কোয়াড্রনের বর্তমান ঘাটতি পূরণে দ্রুত নতুন বিমান অন্তর্ভুক্ত করা।
ভবিষ্যতের বায়ুসেনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
শুধু যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বাড়ানো নয়, ভবিষ্যতের বায়ুসেনাকে প্রযুক্তিগতভাবে আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন এপি সিং।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বায়ুসেনাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর বাহিনীতে পরিণত করতে হবে। ভবিষ্যতের সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা আরও বাড়বে বলে মনে করছে বায়ুসেনা।
এআই ব্যবহার করে তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা এবং বিভিন্ন সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। বায়ুসেনা প্রধানের বক্তব্যে ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
ড্রোন নিয়ে আলাদা বাহিনী নয়
ড্রোন এবং লইটারিং মিউনিশনের ব্যবহারও বাড়াচ্ছে ভারতীয় বায়ুসেনা। তবে এর জন্য আলাদা ড্রোন বাহিনী তৈরির প্রয়োজন দেখছেন না এপি সিং।
তিনি জানিয়েছেন, ড্রোন ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য কোনও বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন নয়, বরং বাহিনীর সক্ষমতার ক্রমবিকাশের অংশ। তাঁর মতে, ড্রোন এবং লইটারিং মিউনিশনকে বর্তমান বাহিনী কাঠামোর মধ্যেই রাখা উচিত।
অর্থাৎ ড্রোনকে আলাদা একটি স্বাধীন বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার পরিবর্তে অন্যান্য অস্ত্র ও সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশীয় প্রযুক্তি ও যুদ্ধবিমান ইঞ্জিনে জোর
বায়ুসেনা প্রধান আত্মনির্ভরতার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সামগ্রিক যুদ্ধপ্রস্তুতির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দেশীয় যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি। ভারতের অন্তত একটি দেশীয় যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন এপি সিং।
দেশীয় যুদ্ধবিমান তৈরির ক্ষেত্রে ইঞ্জিন প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়। তাই ভবিষ্যতে দেশীয় যুদ্ধবিমান প্রকল্পগুলির সঙ্গে নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরির সক্ষমতাও ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
ফ্লাইদুবাইয়ের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের প্রশংসা
সাংবাদিক বৈঠকে ফ্লাইদুবাইয়ের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের বিষয়েও কথা বলেন এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং। পাইলটের পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তাঁর কাজ অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে এবং তিনি দৃঢ় শারীরিক ও মানসিক সংকল্প দেখিয়েছেন। এপি সিংয়ের মতে, এই ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
সামনে একাধিক যুদ্ধবিমান প্রকল্প
ভারতীয় বায়ুসেনার আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে এখন একাধিক প্রকল্প একসঙ্গে এগোচ্ছে। এএমসিএ দেশের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রধান দেশীয় প্রকল্প। পাশাপাশি ১১৪টি রাফাল কেনার প্রস্তাব, অন্যান্য যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্তি এবং দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে ৪২টির অনুমোদিত শক্তির বিপরীতে ২৯টি ফাইটার স্কোয়াড্রন থাকায় দ্রুত নতুন যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করা বায়ুসেনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। সেই সঙ্গে এআই, ড্রোন, লইটারিং মিউনিশন এবং দেশীয় ইঞ্জিন প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে বাহিনী।
এএমসিএ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে এগোলে দেশীয় পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনাই সামনে থাকবে। তবে প্রকল্পে দেরি হলে বিদেশি বা অন্য কোনও যুদ্ধবিমান প্ল্যাটফর্ম নিয়ে সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন বায়ুসেনা প্রধান। রাশিয়ার এসইউ-৫৭ নিয়ে প্রস্তাব থাকলেও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।