রবীন্দ্রনাথের বাইশে শ্রাবণ ও আত্মহননের সুর – রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
দশ বছর ধরে পদ্মানদী আর নতুন বৌদিদি একাকার হয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের চেতনায়, অবচেতনের স্তরে স্তরে। পদ্মার টান তাই রবীন্দ্রনাথকে কত সহজে উপড়ে নিয়ে এলো ভরা সংসারের সমস্ত শিকড় ছিঁড়ে। কেমন এই নতুন নেশার বিপজ্জনক ডাক? রবীন্দ্রনাথ নিজে জানাচ্ছেন আমাদের চেনা সব আটপৌরেমি হেলায় উড়িয়ে দিয়ে: ‘জলের স্রোত বিদ্যুতের মত বোটটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িরা লোগি হাতে করে সামলাবার চেষ্টা করছে। পাছে (এই টান) ডাঙ্গার উপর বোটটাকে আছড়ে ভেঙে ফেলে। এদিকে হুহু করে বাদলার বাতাস দিচ্ছে। ঘন মেঘ করে রয়েছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। এক একবার প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও বোটটা ডেঙ্গায় ঠেকে মড়মড় শব্দে একেবারে কাত হবার উপক্রম করছে। এমনিতর গেল গেল শব্দ করতে করতে খোলা নদীতে এসে পড়লুম।’
যে স্রোত এবং বেসামাল টানের বর্ণনাটা দিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার রেখায় রেখায় কী অনবদ্য নৈপুণ্যে তিনি ফুটিয়ে তুললেন অবৈধ প্রেম আর পরকীয়ার সমস্ত ঝুঁকি, টেনশন, উদ্বেগ ও আকর্ষণ! কাদম্বরীকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে, এবং পদ্মার মধ্যে এই নারীর উন্মাদনা ও আকর্ষণ খুঁজে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন এই রিস্ক নিয়ে বেঁচে থাকার নেশায় পড়েছিলেন। এবং এ কথা তিনি জানতেন, যে কোনও দিন তিনি দুর্ঘটনায় মরতে পারেন। আর কোনও বাঙালি বাউন্ডুলেকে আমি জানি না, যিনি তাঁর যৌবনের দশটা বছর কলকাতার বাড়ি ও সংসারের সব আরাম, নিশ্চয়তা, মায়া-মমতা খড়কুটোর মতো ত্যাগ করে এমন জীবনমরণ রিস্ক নিয়ে দুরন্ত নদীযাপন করেছেন। কলকাতার জন্যেও রবীন্দ্রনাথের তেমন কোনও মমতা নেই। তিনি কলকাতায় জন্মেছেন। কলকাতায় বড় হয়েছেন। কলকাতায় শেষও হয়েছে তাঁর জীবন। কিন্তু কলকাতাকে ভালবাসেননি। কলকাতার মানুষের প্রতি তাঁর তেমন ভক্তি-শ্রদ্ধা আছে বলেও তো মনে হয় না। বরং কলকাতার কথা মনে এলে তাঁর মধ্যে ঘৃণার ভাব দেখা দেয়। কলকাতার বিষয়ে তরুণ রবীন্দ্রনাথের একটি বাক্য স্মরণ করছি: ‘কলকাতার নানান কঠিন করস্পর্শের অনুরণন এখনো সমস্ত স্নায়ুর মধ্যে রিরি করছে।’
কত আঘাতের অভিমান, কত অবিরল অপমান, কত চাপা বেদনা ওই রিরি শব্দটার মধ্যে পুরে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ! অনেক বিখ্যাত বাঙালি কবি-সাহিত্যিক কলকাতায় না জন্মেও পড়িমড়ি করে কলকাতার হতে চেয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গঙ্গাতীরে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের কলকাতার প্রাসাদে জন্মেও অনেক বেশি পদ্মাচরের এবং বীরভূমের শান্তিনিকেতনের! গঙ্গার কোলে জন্মেও তিনি পদ্মাকে বেশি ভালোভাসলেন। কিন্তু গঙ্গাকে উপেক্ষা করলেন না। গঙ্গাকে করে তুললেন রোম্যান্টিক প্রেক্ষিত, তাঁর সঙ্গে নতুন বৌঠানের প্রণোদিত প্রণয়ের। কেমন সেই রোম্যান্টিক প্রেক্ষাপট, যার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই আজকের কলকাতায়? কিন্তু সেই পরম প্রেক্ষিতের ছবি আজও জ্যান্ত হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের কথার ক্যামেরায়।
১৮৮১ সাল। প্রকাশিত হলো রবীন্দ্রনাথের ‘ভগ্নহৃদয়’ কাব্যগ্রন্থ। উৎসর্গ পত্রে লেখা এক রোম্যান্টিক সংকেত: ‘শ্রীমতি হে-কে’। একমাত্র কাদম্বরী জানেন, তিনিই রবির চুপিচুপি ‘হে’! অর্থাৎ ‘হে-কে’টি। রবি তো তাকে গোপনে হেকেটি বৌঠান নামেই ডাকে। রবি বলেছে, হেকেটি তো পাতালের গ্রিক দেবী। সে থাকে অন্ধকার গোপনে। তোমার-আমার সম্পর্কের মতো অন্ধকারে। ঠাকুরবাড়ি কেঁপে উঠল এই উৎসর্গের ইঙ্গিতে।
এই ঘটনার ক’দিনের মধ্যে চন্দননগরে গঙ্গাতীরের বাগানবাড়িতে শুরু রবির সঙ্গে তাঁর প্রিয় বৌদির প্রবল প্রণয়পর্ব। এবার রবীন্দ্রনাথের নিজের বর্ণনায়: ‘গঙ্গা সাঁতরে তখন এপার ওপার হতাম। নতুন বৌঠান দেখে আতঙ্কে শিউরে উঠতেন। কত বেড়িয়েছি নতুন বৌঠান আর আমি বনে জঙ্গলে, কত কুল পেড়ে খেয়েছি। এ ভরা বাদর মাহ্ ভাদর শূন্য মন্দির মোর, বিদ্যাপতির এই গানে এখানেই সুর দিই। সুর দিয়েই নতুন বৌঠানকে শোনাতুম। খুব ভালোবাসতুম তাঁকে। তিনিও আমাকে খুব ভালোবাসতেন।’ গঙ্গার তীরে মোরান সাহেবের বাগানবাড়িতে নতুন বৌদির সঙ্গে রোমান্স রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এল একটু অন্য ভাবে: ‘আমার গঙ্গাতীরের সেই সুন্দর দিনগুলি গঙ্গার জলে উৎসর্গ করা পূর্ণ বিকশিত পদ্মফুলের মতো একটি একটি করিয়া ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কখনো বা সূর্যাস্তের সময়ে আমরা নৌকা লহিয়া বাহির হইয়া পড়িতাম, আমি গান গাহিতাম। আমরা যখন বাগানের ঘাটে ফিরিয়া আসিয়া নদীতীরের ছাদটার উপর বিছানা করিয়া বসিতাম, তখন জলে স্থলে শুভ্র শান্তি, নদীতে নৌকা প্রায় নাই, তীরের বনরেখা অন্ধকারে নিবিড়, নদীর তরঙ্গহীন প্রবাহের উপর আলো ঝিকঝিক করিতেছে। এক একদিন সেই গঙ্গাতীরে বাগানবাড়িতে রান্নার আয়োজন বকুলগাছতলায়। সেই রান্নায় মশলা বেশি ছিল না, ছিল হাতের গুণ। সেই গঙ্গার ধার মনে পড়ে? সেই জ্যোৎস্নালোক? সেই দুজনে মিলিয়া কল্পনার রাজ্যে বিচরণ? সেই মৃদু গম্ভীর স্বরে গভীর আলোচনা? সেই দুই জনে স্তব্ধ হইয়া বসিয়া থাকা? তাহারা সব চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু আমার এই ভাবগুলির মধ্যে তাহাদের ইতিহাস লেখা রহিল। এক লেখা তুমি আমি পড়িব, আর এক লেখা আর সকলে পড়িবে। সেই জানলার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলি মনে পড়ে, সেই অশ্রুজলে সিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলিকে মনে পড়ে, সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল, সেইটে দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সেই তো যথার্থ কবিতা লিখিয়াছিল। তাহার সেই অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হইল না, আর আমার রচিত গোটাকতক অর্থহীন হিজিবিজি ছাপা হইয়া গেল।’