৭২ ঘণ্টা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে নিষেধাজ্ঞা, সরকারি নির্দেশিকা ঘিরে ফের প্রকট ডাক্তারদের ‘আমরা-ওরা’
অনির্বাণ ঘোষ
বৈষম্য একটা ছিলই। বেতন এক, পদও অভিন্ন। কিন্তু নন-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ের সরকারি শিক্ষক-চিকিৎসকদের মধ্যে কাজের দায়িত্বে ঢের ফারাক। রোগী ভর্তির পরে ৭২ ঘণ্টা প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অর্ডার সেই বৈষম্যকেই আরও তীব্র ও প্রকট করে তুলল বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
নন–ক্লিনিক্যালের দু’টি ভাগ। প্রি–ক্লিনিক্যাল ও প্যারা ক্লিনিক্যাল। অ্যানাটমি, ফিজ়িওলজি, বায়োকেমিস্ট্রির মতো প্রি-ক্লিনিক্যাল বিষয়ের শিক্ষক-চিকিৎসকদের মূলত পড়ালেই চলে, রোগী দেখতে হয় না। প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, রেডিয়োলজির মতো প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়ের ফ্যাকাল্টিদের পড়ানোর পাশাপাশি রোগী দেখতে না হলেও রোগী পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। তাঁদের অধীনে রোগী ভর্তিও হন না। অথচ জেনারেল মেডিসিন, জেনারেল সার্জারি, গাইনি, অর্থোপেডিক, পেডিয়াট্রিক্সের মতো ক্লিনিক্যাল বিষয়ের শিক্ষক-চিকিৎসকদের পড়ানোর পাশাপাশি আউটডোর, ইমার্জেন্সি, ইনডোরে রোগী দেখতে হয়। সার্জেনদের এর সঙ্গে অস্ত্রোপচারও করতে হয়। তাঁদের অধীনেই ভর্তি হন রোগী। অথচ বিষয় বা কাজের বহর যা-ই হোক, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও প্রফেসরের ন্যূনতম বেতন যথাক্রমে প্রায় ১.০৯, ১.৫৩ ও ১.৮৯ লক্ষ টাকা।
এই বৈষম্য ক্লিনিক্যাল ফ্যাকাল্টিরা একপ্রকার মেনেই নিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক আদেশনামায় রোগী ভর্তির পর টানা তিন দিন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে নিষেধাজ্ঞা আসায় ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রি ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিভাগের ফ্যাকাল্টিরা সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব শেষ করে অনায়াসে প্রাইভেট চেম্বারে যেতে পারবেন। কারণ, তাঁদের অধীনে রোগী ভর্তি হয় না বলে ‘অ্যাডমিশন ডে’-সংক্রান্ত নির্দেশিকাও কার্যকর নয়। অথচ সেই রোগী ভর্তির গেরোতেই আটকে যাচ্ছেন ক্লিনিক্যাল ফ্যাকাল্টিরা।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের এক শিক্ষক-চিকিৎসকের কথায়, ‘সকাল থেকে ওয়ার্ডে রোগী দেখা, নতুন রোগী ভর্তি, চিকিৎসা ও জরুরি পরিষেবার দায়িত্ব সামলে দিন কাটছে এক জনের। আর পাশের বিভাগে সেই দায়িত্বই নেই! অথচ দু’জনেরই পদ একই, বেতন কাঠামোও এক। একজনের অধীনে রোগী ভর্তি হয় বলে তিনি অ্যাডমিশন ডে-র পরে আরও দু’দিন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। অথচ পাশের বিভাগের ফ্যাকাল্টির অধীনে রোগী ভর্তির চল নেই বলে স্বচ্ছন্দে তিনি প্রাইভেট চেম্বার করতে পারবেন। এ কেমন অনাচার!’
তাঁর সুরেই অন্য অনেক চিকিৎসকেরই বক্তব্য, যে ফ্যাকাল্টি তুলনামূলক ভাবে কম দায়িত্ব পালন করেন, তিনি নিয়মিত প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ যে শিক্ষক-চিকিৎসক বেশি সময় হাসপাতালে দিয়ে রোগীর চিকিৎসা ও পরিষেবার ভার সামলাচ্ছেন, তাঁর উপরেই অতিরিক্ত বিধিনিষেধ! সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন, অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মানস গুমটাও মনে করেন, ‘অ্যাডমিশন ডে সংক্রান্ত এই নির্দেশিকায় ক্লিনিক্যাল ও নন-ক্লিনিক্যাল শিক্ষক-চিকিৎসকদের মধ্যে সহকর্মীসুলভ স্বাভাবিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টিতে অপ্রয়োজনীয় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে।’
সরকারি চিকিৎসকদের আর এক সংগঠন, সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সজল বিশ্বাস বলেন, ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিসের উপরে বিধিনিষেধ সংক্রান্ত এই নির্দেশিকা এতটাই অবৈজ্ঞানিক ও অগণতান্ত্রিক যে, এর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য পরিষেবার উপরেই নয়, চিকিৎসকদের মধ্যেও বৈষম্য তৈরি করবে। প্রি ও প্যারা-ক্লিনিক্যালের পাশাপাশি কিছু ক্লিনিক্যাল বিষয়ের অধীনেও এমন বিভাগ রয়েছে, যেখানে চিকিৎসকদের অধীনে রোগী ভর্তি হন না। ফলে তাঁদের কোনও অ্যাডমিশন ডে থাকে না এবং এই নির্দেশিকার বিধিনিষেধও তাঁদের জন্য কার্যত প্রযোজ্য হচ্ছে না।’
শুধু আলাদা বিষয়ের ফ্যাকাল্টিদের মধ্যেই নয়, একই বিষয়ের চিকিৎসকদের মধ্যেও বৈষম্যের আশঙ্কা দেখছেন অনেকে। এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের এক অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের বক্তব্য, ‘এসএসকেএম ছাড়া ফিজ়িক্যাল মেডিসিন বিভাগে অন্য কোনও মেডিক্যাল কলেজে কোনও বেড নেই। ফলে এসএসকেএমের ফ্যাকাল্টির অধীনে রোগী ভর্তি হয়, তিনি অ্যাডমিশন ডে-র সময়ে তিন দিন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। অথচ একই বিষয়ের অন্য মেডিক্যাল কলেজের ফ্যাকাল্টিদের কোনও বাধা নেই। একই কথা প্রযোজ্য ত্বকরোগ-সহ একাধিক শাখায়।’