ছেলে-মেয়ের মৃত্যুতেও মেলেনি ছুটি, 'ঢের হয়েছে', কাজই ছাড়ছেন সন্তানহারা বাবা
শুভাশিস সৈয়দ, বহরমপুর
সেই আরব মুলুকে বসেই তিনি আর পাঁচ দিনের মতো ফোনটা ধরেছিলেন। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে ‘হ্যালো’ বলতেই ফোনের এ প্রান্ত থেকে আছড়ে পড়েছিল হাহাকার, ‘ওগো, ঈশানুর আর নেই! শিগ্গির বাড়ি ফিরে এসো…।’
শুক্রবার সকালে মুর্শিদাবাদের ভয়াবহ রেল–দুর্ঘটনায় আরও চার জনের সঙ্গে মৃত্যু হয় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ঈশানুর রহমানের (৮)। ওই দিনই ফোন পেয়ে তার বাবা আফজালুর রহমান অফিস কর্তৃপক্ষের কাছে একমাত্র সন্তানের মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে ছুটি চেয়েছিলেন। কিন্তু, অনুমোদন মেলেনি। শনিবার তিনি বাড়ির লোকজনকে ফোন করে বলেছেন, ‘ঢের হয়েছে। এ চাকরি আর নয়। আরবের সব পাট চুকিয়ে একেবারেই ঘরে ফিরব।’ পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে পাকাপাকি ভাবে গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দ্বিতীয় শ্রেণির তমান্না পারভিনের (৭) বাবা ইসরাফিল শেখও।
বৃষ্টি, যানবাহনের চাকা ও পায়ে-পায়ে মুছে গিয়েছে রক্তের দাগ। শনিবার খাগড়াঘাট রোড ও কর্ণসুবর্ণ স্টেশনের মাঝে সেই রেলগেট দিয়ে যাতায়াতের পথে কেউ শিউরে উঠেছেন, কেউ আপনমনে বিড়বিড় করেছেন, ‘ভাবতেই পারছি না যে, গতকাল এখানেই পাঁচ–পাঁচটা প্রাণ শেষ হয়ে গিয়েছে!’
বহরমপুর থানার গোবিন্দপুর শুক্রবারের ঘটনার পর থেকেই বাক্রুদ্ধ। গ্রামের বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ। কেউ কাজে যাননি। গ্রামের হেফজুর রহমান বলছেন, ‘বাচ্চাগুলোর মুখ মনে পড়লেই বুক ফেটে যাচ্ছে। কাজে যাওয়ার মতো মনের জোর নেই।’
বহরমপুরের ডাবকই গ্রামের ফারহানা বেগমের (৫) বাবা মাকারুল হক ও জেসিকা শবনমের (৮) বাবা শহিদ আলি দু’জনেই মুম্বইয়ে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। খবর পেয়ে বিমান ধরে দ্রুত তাঁরা গ্রামে ফিরেছেন। তবে, কেউই মেয়ের মুখ দেখতে পাননি। ততক্ষণে সকলকেই সমাহিত করা হয়ে গিয়েছে।
কোনও রকমে নিজেকে একটু সামলে মাকারুল বলছেন, ‘জানেন, ফারহানাটা আমার খুব নেওটা ছিল। বাড়ি ফিরলে কিছুতেই পিছু ছাড়ত না। সেই মেয়েটাকে শেষ বারের মতো চোখের দেখাটুকুও দেখতে পেলাম না।’ শহিদের কথায়, ‘দিন ২০ আগে মুম্বইয়ে গিয়েছিলাম। মেয়ের খবর শুনেই ফিরে এলাম। কিন্তু…।’
ঈশানুরের মা আজিজা বিবি বলেন, ‘সারাটা দিন ছেলেকে নিয়ে আমার সময় কাটত। ওর বাবা সৌদিতে থাকে বলে সব দায়িত্ব ছিল আমার। সেই ঈশানকে (ডাকনাম) ছাড়া কী ভাবে থাকব, বলুন তো!’ জেসিকার মা জেসমিন সুলতানার কথায়, ‘জেসিকা স্কুল ইউনিফর্ম পরে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পুলকার আসার পরে শরীর খারাপ করছে বলে জল খেতে চাইল। খাইয়ে দিলাম। হাত নেড়ে হাসিমুখে গাড়িতে উঠে পড়ল। কিন্তু, মেয়ে মাঝের সিটে কখন বসেছিল, বুঝতে পারছি না। শরীর খারাপ করছে বলে কি মাঝের সিটে চলে গিয়েছিল? কে জানে!’
প্রতিদিন স্কুলের গাড়িতে ওঠার আগে তমান্না বলত, ‘আসছি আম্মু।’ সেই কথাটাই বারবার কানে বাজছে মা শুকরুন্নেষা বিবির। তাঁর কথায়, ‘আসছি আম্মু বলে সে দিনও গাড়িতে উঠেছিল। ফিরল নিথর দেহটা। মেয়েটা ফিরল না!’