তিনি ও তাঁর ‘গ্র্যান্ডমাদার অফ ইউনিভার্সিটিজ়’!
প্রতিষ্ঠান মানুষকে তৈরি করে, না কি মানুষ প্রতিষ্ঠানকে? প্রশ্ন দীর্ঘ দিনের, উত্তরও জটিল। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যত দিন থাকবে, তত দিন থাকবেন তার সর্বাগ্রগণ্য পরিচালক, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। ২৫ মে তাঁর প্রয়াণ দিবস।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা সহজ কথা নয়। পশ্চিমি আধুনিকতার মোড়কে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যে জ্ঞানচর্চার পরিসর বোঝায়, প্রকৃত অর্থে ভারতে তার অগ্রদূত হিন্দু কলেজ (আজ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)। খাতায়-কলমে অবশ্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু হিন্দু কলেজের সঙ্গে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে নির্মিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মৌলিক তফাত ছিল। হিন্দু কলেজ ছিল পড়াশোনার জায়গা, তৈরির কৃতিত্ব কলকাতার বাঙালি হিন্দুদের। পরিচালন সমিতিতে ছিলেন বাঙালি মান্যগণ্যেরা— গোপীমোহন দেব, রাধাকান্ত দেব, তেজচন্দ্র বাহাদুর, গোপীমোহন ঠাকুর, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রমুখ। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সাহেবদের তৈরি, এবং শুরুতে ছিল নেহাত এক ছাতার মতো সংস্থা, যাদের কাজ শুধু পরীক্ষা নেওয়া ও ডিগ্রি দেওয়া। পড়াশোনা যা হতো, সবই অধীন নানা কলেজে। এক্তিয়ার অবশ্য ছিল বিশাল— পশ্চিমে পেশোয়ার থেকে পুবে রেঙ্গুন! সাহেবরা তো বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেই খালাস। কিন্তু তৈরির পিছনে যে মহৎ উদ্দেশ্য ছিল, তাকে কাজে পরিণত করতে ব্রিটিশ সরকারের গড়িমসি ছিল। বরং হিন্দু কলেজের মতোই, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে দিনের গৌরবের পিছনেও ছিলেন কিছু দেশীয় উদ্যোগপতি। আর ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক উপাচার্য, যিনি প্রায় একার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠানটিকে এশিয়ার অন্যতম সেরা জ্ঞানচর্চা-কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করেন।
আশুতোষের বাবা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ডাক্তার। যদিও আশুতোষের আগ্রহ ছিল অঙ্কে। ১৮৭৯-এ, ১৫ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। অঙ্কে বিএ ও এমএ পাশ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে, পরে পদার্থবিদ্যাতেও সেই ফল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে খ্যাতনামা বৃত্তি ছিল প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলারশিপ। ১৮৮৬-তে প্রাপক ছিলেন আশুতোষ। কিন্তু অঙ্কের এমন প্রতিভা হয়েও শেষ অবধি অঙ্কের অধ্যাপক না হয়ে বেছে নেন আইন। সেখানেও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। কাজ করেন উকিল ও কংগ্রেস নেতা রাসবিহারী ঘোষের অধীনে। ১৯০৪-এ আইনজীবী থেকে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির পদে উন্নীত হন।