লাদাখে বড় প্রশাসনিক বদল! কার্গিল কাউন্সিল ভেঙে ৮ জেলায় ১০০টি নির্বাচিত আসন
নয়াদিল্লি: লাদাখে স্থানীয় স্বশাসন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসন। জেলা পুনর্গঠনের পর পুরনো কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে কার্গিলের স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে লাদাখের আটটি পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদের জন্য মোট ১০০টি নির্বাচিত আসন নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় লেহ ও কার্গিলের পাশাপাশি আরও ছয়টি জেলার বাসিন্দারাও পৃথক পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রতিনিধিত্ব পাবেন।
লাদাখ প্রশাসনের জারি করা নির্দেশ অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর মুখ্য কার্যনির্বাহী কাউন্সিলর, তিনজন কার্যনির্বাহী কাউন্সিলর এবং আরও ছ’জন পরিষদ সদস্য পদত্যাগ করার পর কার্গিল কাউন্সিল বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি, জেলা সীমানার পরিবর্তনের ফলে পুরনো কাউন্সিলের প্রশাসনিক এলাকার সঙ্গে নতুন জেলা কাঠামোর অসঙ্গতিও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত কার্গিলের জেলাশাসক তথা ডেপুটি কমিশনার এবং মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক আগের কাউন্সিলের দায়িত্ব সামলাবেন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপরিষেবা এবং উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও থাকবে তাঁদের উপর।
আটটি পার্বত্য পরিষদে কোথায় কত আসন?
নতুন বিজ্ঞপ্তিতে আটটি পরিষদের জন্য সরাসরি নির্বাচিত সদস্যের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। আসন বণ্টন অনুযায়ী, লেহে ২২টি এবং কার্গিলে ২১টি আসন থাকবে। অন্য ছয়টি জেলার মধ্যে সাঙ্কুতে ১৩টি, চাংথাংয়ে ১০টি এবং নুব্রা, শাম ও জাংস্কার, প্রতিটিতে ন’টি করে আসন নির্ধারিত হয়েছে। দ্রাসে থাকবে সাতটি আসন।
| জেলা বা পরিষদ | নির্বাচিত আসন |
| লেহ | ২২ |
| কার্গিল | ২১ |
| সাঙ্কু | ১৩ |
| চাংথাং | ১০ |
| নুব্রা | ৯ |
| শাম | ৯ |
| জাংস্কার | ৯ |
| দ্রাস | ৭ |
| মোট | ১০০ |
আগের ব্যবস্থায় লেহ ও কার্গিলের দুটি পার্বত্য পরিষদে ২৬টি করে আসন ছিল। অর্থাৎ, মোট নির্বাচিত আসন ছিল ৫২টি। নতুন বিজ্ঞপ্তিতে তা বেড়ে ১০০ হয়েছে। তবে সংশোধিত আইনে প্রতিটি পরিষদে নির্বাচিত সদস্যের সংখ্যা সাত থেকে ২৪-এর মধ্যে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তার এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে আসন নির্ধারণের জন্য এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এ ছাড়া, মহিলা এবং পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না-পাওয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিটি পরিষদে চারজন পর্যন্ত মনোনীত সদস্য রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।
জেলা পুনর্গঠনের পর কেন ভাঙল কার্গিল কাউন্সিল?
লাদাখ আগে লেহ ও কার্গিল, এই দুই জেলায় বিভক্ত ছিল। দুই জেলাতেই ১৯৯৭ সালের লাদাখ স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী পৃথক কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীরের অবিভক্ত রাজ্যের অংশ থাকাকালীন এই ব্যবস্থা চালু হয়। পরিষদগুলির হাতে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, কিছু কর আদায় এবং নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাজের দায়িত্ব রয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে লাদাখ প্রশাসন নুব্রা, শাম, চাংথাং, জাংস্কার ও দ্রাস, এই পাঁচটি নতুন জেলা গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ৩০ এপ্রিল সেগুলির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরে ১৬ অক্টোবর সাঙ্কুকে অষ্টম জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সাঙ্কু গঠিত হয়েছে অবশিষ্ট কার্গিল জেলার অংশ নিয়ে। এর আওতায় সাঙ্কু, জিএম পোরে, টিএসজি ও তাইসুরু তহসিল রয়েছে।
নতুন জেলা গঠনের ফলে লাদাখে তহসিলের সংখ্যা বেড়ে ৩৭ হয়েছে। একই সঙ্গে পুরনো কার্গিল জেলার বড় অংশ দ্রাস, জাংস্কার ও সাঙ্কুর মতো নতুন প্রশাসনিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে আগের কার্গিল কাউন্সিলের ভৌগোলিক এক্তিয়ার আর বর্তমান জেলা সীমানার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছিল না।
লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর বিনয় কুমার সাক্সেনা এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর এসও ২৫৯ এবং ১৬ অক্টোবর এসও ২৮৫ নম্বর বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন জেলাগুলিতে পৃথক স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
সংশোধিত আইনে বদল আসন বণ্টনের নিয়মে
১৯৯৭ সালের লাদাখ স্বশাসিত পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ আইনে সংশোধন এনে ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধি কার্যকর করা হয়েছে ১৯ অক্টোবর থেকে। আগের নিয়মে প্রতিটি পরিষদের সদস্যসংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল ২৬। নতুন ব্যবস্থায় প্রশাসনকে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচিত আসন নির্ধারণের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট গভর্নর বিনয় কুমার সাক্সেনা ১০০টি নির্বাচনী আসন নির্ধারণকে লাদাখের তৃণমূল স্তরের গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আসন বণ্টনের সময় পঞ্চায়েত হালকা ও পুরসভার ওয়ার্ডকে প্রাথমিক একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি, যোগ্য ভোটারের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার ভৌগোলিক বিস্তারও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, আসনসংখ্যা বাড়লে স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বাড়বে এবং নির্বাচিত পরিষদের মাধ্যমে উন্নয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও বিস্তৃত হবে।
নির্বাচন নয়, আগে হবে সীমানা নির্ধারণ
নতুন পরিষদগুলির নির্বাচন আয়োজনের আগে প্রতিটি আসনের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন। ১০০টি নির্বাচিত আসনের বিজ্ঞপ্তি সেই কাজের ভিত্তি তৈরি করেছে।
কার্গিল কাউন্সিল বিলুপ্তির নির্দেশে ১৯৯৭ সালের আইনের ৩(১) ধারা, ৫৫ ধারা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিধানের উল্লেখ রয়েছে। জেলা সীমানা বদলে যাওয়ায় পুরনো কাঠামোতে কাউন্সিলের কাজ চালানো আইনগতভাবে সম্ভব নয় বলে প্রশাসনিক নির্দেশে জানানো হয়েছে।
এখন পরবর্তী ধাপে নির্বাচনী এলাকার সীমানা চূড়ান্ত করা, নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং সংশোধিত আইন অনুযায়ী আটটি পরিষদ গঠন করার কাজ এগোবে। তত দিন কার্গিলের জেলাশাসক ও মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক পুরনো কাউন্সিলের দায়িত্ব সামলাবেন।
নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সীমানা নির্ধারণ কত দ্রুত শেষ হয়, নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হয় এবং নতুন পরিষদগুলি কীভাবে স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করে, তার উপর।