সংঘাত বাড়ছে শহরে, সাপে-মানুষে সহাবস্থান তবে কোন পথে?
এই সময়: নাগিন থেকে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না- দুটো সুপারহিট সিনেমা। অথচ সামনে সাপ দেখলেই আমরা ভাবি, মেরে দিই। কেন বলুন তো? দর্শকদের দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েছিলেন জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরটাও দিলেন তিনিই ‘আসলে সাপকে আমরা বলি ‘ওয়ার্ল্ডস মোস্ট মিসআন্ডারস্টুড’ ক্রিচার। সাপকে ঘিরে এত বিশ্বাস, সংস্কার-কুসংস্কার, পৌরাণিক কথা, সাহিত্য থেকে সিনেমা… অথচ সেই প্রাণীকেই নির্বিবাদে মারা হয় অযাচিত ভয় থেকে।’
নিউ টাউনে আয়োজিত ‘কোএগজ়িস্টিং উইথ স্নেক ইন আরবান স্পেসেস’ শীর্ষক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি ধৃতি যখন এ কথা বলছেন, তখন আলোচনার স্রোত বইছে সেই জরুরি উত্তরের খোঁজে নগরায়ণের এই জেট গতির সামনে সাপে-মানুষে সহাবস্থান কী ভাবে সম্ভব!
প্রশ্নটা যতটা প্রাসঙ্গিক, সাপের প্রতি শহুরে মানুষের ভীতিটাও ততটাই স্বাভাবিক মনে করিয়েছেন ধৃতি। জানিয়েছেন, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ভারতে এক বছরে অন্তত ৩০-৪০ লক্ষ সাপে কাটার ঘটনা ঘটে, মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। ফলে সামনে সাপ দেখলে সাধারণ মানুষ ভাবেন না, ওরা বিষধর কি না। ভয় থেকেই সাপ মারার প্রবণতা তৈরি হয়ে যায়।
দ্রুত নগরায়ণে সাপের বাসস্থানে টান পড়া এবং মানুষ-সাপের মধ্যে এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেডএসআই উত্তর-পূর্ব ভারতে টানা কাজ করছে সে কথা জানিয়ে ধৃতির বক্তব্য, ‘এখন অন্তত সাপের চামড়া বা খোলস থেকে ব্যাগ-বেল্ট তৈরির জন্য ওদের মারা হচ্ছে না। এটা বড় পাওনা।’
রবিবার বিকেলে এই আলোচনার যে সভাস্থল, সেই রাজারহাট-নিউ টাউন এলাকাতেই গত কয়েক বছরে সাপে কাটার ঘটনা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। রাজারহাট-গোপালপুরের বিধায়ক তথা অনুষ্ঠানের ‘গেস্ট অফ অনর’ ৫০ তরুণজ্যোতি তিওয়ারির কথাতেও সেই দুশ্চিন্তা স্পষ্ট।
তরুণজ্যোতির কথায়, ‘আরও পাঁচটা প্রাণীর মতো মানুষও প্রকৃতির একটা সৃষ্টি। সেই বাস্তবটা স্বীকার করতে পারলে সহাবস্থানের ভাবনাটাও প্রাধান্য পাবে। নগরায়ণের দাপটে রাজারহাট নিউ টাউন থেকে চন্দ্রবোড়া তো কার্যত হারিয়েই গিয়েছে। ১৪০ রকমের পাখি ছিল রাজারহাটে। ফিশিং ক্যাট, জাঙ্গল ক্যাট, গোল্ডেন জ্যাকল ছিল কিছুই আর নেই। পূর্ব বর্ধমানের ছোট পশলা-সহ একাধিক গ্রামে গিয়ে দেখেছি, কী ভাবে সব ধরনের সাপের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক সহাবস্থান রয়েছে। অথচ শহুরে এলাকায় সাপ শুনলেই মানুষ ভয় পায়। কারণ সচেতনতার অভাবও রয়েছে। আমরা দেখছি যাতে বেশি সংখ্যক সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রাখা যায়।’
অ্যান্টিভেনম বা সাপের বিষের প্রতিষেধক যে রাজারহাট-নিউ টাউনে কতটা জরুরি, মনে করিয়েছেন অনুষ্ঠানের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক তথা প্রকৃতি সংরক্ষণে ব্রতী শিলাদিত্য চৌধুরী। তাঁর কথায়, ‘এই অঞ্চলে রোজ অন্তত চার-পাঁচটা সাপে কাটার ঘটনা ঘটে। আমরা চাই নির্দিষ্ট তথ্য ও সচেতনতার ভিত্তিতে সাপে-মানুষে সহাবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হোক। তাই জৈন গ্রুপের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কিউআর কোড-সহ একটি স্টিকার তৈরি করা হয়েছে, যা স্ক্যান করে মানুষ সাপ বেরোনোর ঘটনা জানাতে পারবে বন দপ্তরে।’
সাপের বিষের প্রতিষেধক থাকার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন ভারত সরকারের সঙ্গে কাজ করা স্টার্টআপ সংস্থা মনসা বায়োটেকের অন্যতম কর্ণধার সৌরভ রায়ও। তাঁর কথায়, ‘নগরায়ণে শুধু সাপের জায়গা কমছে বা তারা এলাকাছাড়া হচ্ছে- এমন নয়। হঠাৎ শহুরে হওয়া এলাকায় কংক্রিটের কাঠামোর খাঁজে যে বিষধর চন্দ্রবোড়া (রাসেল ভাইপার) ৫০-৬০টা বাচ্চা দিচ্ছে, তাদের সবাই বেঁচে যাচ্ছে। কারণ, ওদের শিকার করার মতো পাখিই নেই সেই এলাকায়।’
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ভারতে। অথচ এ দেশেই বিশ্বের সর্বাধিক অ্যান্টিভেনম তৈরি হয়। তার পরেও কেন মৃত্যুমিছিল রোখা যায় না? সৌরভের বক্তব্য, ‘দক্ষিণ ভারতে তৈরি অ্যান্টিভেনম দেশের বাকি এলাকায় সমান কার্যকর হচ্ছে না। সে দিকে নজর প্রয়োজন।’