Five years of NEP 2020: জাতীয় শিক্ষানীতির ৫ বছর: স্কুলের ভিতরে বাস্তবে কতটা বদলেছে শিক্ষাব্যবস্থা? | Five years of NEP 2020: What has actually changed inside schools?
২০২০ সাল থেকে আপনার কাছের স্কুলটিতে ঠিক কী পরিবর্তন হয়েছে?Image Credit: TV9 Bangla
সোমবার সকালে এক রং মিস্ত্রি এলেন। সঙ্গে একটি মই, নীল রঙের কৌটো এবং শিক্ষা দফতরের দেওয়া একটি কাগজ। গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক, ধরা যাক তাঁর নাম রঘুনাথ, নিচে দাঁড়িয়ে একে একে নতুন শব্দগুলি পড়ে শোনাচ্ছিলেন। পুরনো সাইনবোর্ডে লেখা ছিল ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়’। নতুন বোর্ডে লেখা হবে ‘ফাউন্ডেশনাল স্টেজ’। দুপুরের মধ্যেই পুরনো নাম মুছে গেল। স্কুলের গেটটি দেখতে দেশের যে কোনও আধুনিক স্কুলের মতো হয়ে উঠল। রংমিস্ত্রি হাত মুছে, এক গ্লাস জল খেয়ে চলে গেলেন। মাত্র এক সকালের কাজ আর সামান্য কিছু রঙের খরচেই সম্পন্ন হল গোটা সংস্কার।
নতুন বোর্ডটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রঘুনাথ। তারপর ঘুরে তাকালেন পাশের শ্রেণিকক্ষের দিকে। সেখানে চল্লিশ জন পড়ুয়ার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সুনীতা নামে এক শিক্ষিকা। সামনে একগাদা খাতা আর একটি ব্ল্যাকবোর্ড। রং মিস্ত্রি ওই ঘরের কোনও কিছুই বদলাননি। একই বেঞ্চ, একই চক, একই চল্লিশটি মুখ। আর সেই ক্লান্ত শিক্ষিকা, যিনি গত সপ্তাহে একটি সরকারি নির্দেশিকা পেয়েছেন, কিন্তু এখনও জানেন না, সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী তাঁকে ঠিক কী করতে হবে। এক সকালে বদলে ফেলা যায় একটি সাইনবোর্ড। কিন্তু একটি শ্রেণিকক্ষের প্রকৃত পরিবর্তনে লেগে যায় বছরের পর বছর। জাতীয় শিক্ষানীতির আসল গল্পটা লুকিয়ে রয়েছে এই ব্যবধানের মধ্যেই।
NEP 2020-র পর কাগজে-কলমে কী কী বদলেছে?
১৯৮৬ সালের পর দীর্ঘ ৩৪ বছর কোনও নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরি হয়নি। অবশেষে ২০২০ সালে দেশে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) চালু হয়। ইতিমধ্যেই এই নীতির বেশ কিছু পরিবর্তন কাগজে-কলমে দৃশ্যমান হয়েছে। আগের ১০+২ শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে চালু হয়েছে ৫+৩+৩+৪ কাঠামো। তিন বছর বয়স থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পড়ুয়াদের শিক্ষাকে চারটি পৃথক পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে।
২০২১ সালে চালু হয় নিপুণ ভারত মিশন (NIPUN Bharat)। এর লক্ষ্য অত্যন্ত সহজ, যা একজন ঠাকুমাও বুঝতে পারবেন। তৃতীয় শ্রেণি শেষ করার আগেই প্রতিটি শিশু যেন সাবলীলভাবে পড়তে পারে এবং সাধারণ অঙ্ক করতে শেখে।
২০২২ সালে চালু হয় একটি অভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষা, কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট (CUET)। এর মাধ্যমে একসঙ্গে দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের স্নাতক ডিগ্রি কোর্সও শুরু হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কোনও পড়ুয়া এক বছর পড়াশোনার পর সার্টিফিকেট এবং দু’বছর পর ডিপ্লোমা নিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতে পারেন।
এর পর কয়েকটি সমীক্ষায় প্রাথমিক স্তরে পড়ুয়াদের পড়ার দক্ষতার উন্নতির ইঙ্গিতও মিলেছে। যদিও সেই উন্নতির সূচনা হয়েছে অত্যন্ত নিচু জায়গা থেকে।
শ্রেণিকক্ষের ভিতরে পরিবর্তনের কাজ অনেক ধীর-
লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রতিটি পরিবর্তনের নির্দেশ কোনও দফতরের টেবিলে বসেই দেওয়া সম্ভব। শিক্ষার নতুন কাঠামো ঘোষণা করা যায়, পরীক্ষার দিনক্ষণ ঠিক করা যায়, কোনও প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া যায়।
কিন্তু আসল পরিবর্তনের কাজটি অনেক ধীর। সেই পরিবর্তনকে পৌঁছতে হয় মানুষের হাত ধরে। একজন শিক্ষককে শিখতে হয়, কীভাবে নতুন পদ্ধতিতে পড়ুয়ার মূল্যায়ন করতে হবে। সঠিক বইকে পৌঁছতে হয় সঠিক তাক পর্যন্ত। কোনও ক্লাসকে ডিজিটাল ক্লাসরুম বলার আগে কম্পিউটারে কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগ থাকাও জরুরি।
সুনীতা শুধুমাত্র একটি সরকারি চিঠি পাওয়ার কারণে নতুন শিক্ষিকা হয়ে উঠবেন না। তিনি তখনই বদলাবেন, যখন কেউ তাঁকে নতুন পদ্ধতি হাতে-কলমে শেখাবেন, প্রয়োজনীয় সময় দেবেন এবং তাঁর হাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ তুলে দেবেন।
এরপরই উঠল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার, সেই প্রশ্ন-
এর পর সামনে এল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত নেবে কে? ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, শিক্ষা কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয়েরই যৌথ বিষয়। সংবিধানের যুগ্ম তালিকায় (Concurrent List) শিক্ষাকে রাখা হয়েছে। তাই এত বড় একটি শিক্ষানীতি কার্যকর করতে গিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ভাষানীতিকে কেন্দ্র করে সেই মতপার্থক্য সামনে আসে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে পড়ুয়াদের তিনটি ভাষা শেখার কথা বলা হয়েছে। তবে কীভাবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একদিকে যেমন সমর্থন মিলেছে, অন্যদিকে তেমনই প্রতিবাদও হয়েছে। তামিলনাড়ু এই নীতি কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানায়। রাজ্যের জন্য বরাদ্দ কিছু শিক্ষা তহবিল আটকে রাখা হয়। ২০২৫ সালে এই বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় তামিলনাড়ু সরকার।
মহারাষ্ট্রেও প্রাথমিক স্কুলে তৃতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার একটি নির্দেশ জারি হয়েছিল। কিন্তু জনসাধারণের প্রতিবাদের মুখে একই বছর সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেয় রাজ্য সরকার। প্রতিটি পক্ষই দাবি করছে, তারা শিশুদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে। এবং প্রত্যেকের বক্তব্যের পিছনেই রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি। এতগুলি ভাষার দেশে ভাষার প্রশ্ন যে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক।
একটি শিশুর জীবনে পাঁচ বছর অনেকটা সময়-
পাঁচ বছরের মধ্যেই এই শিক্ষানীতিকে ব্যর্থ বলে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, এত বড় শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের ফলাফল বুঝতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু একটি শিশু সময়কে অন্যভাবে দেখে। ২০২০ সালে যে ছেলেটি প্রথম শ্রেণিতে পড়তে বসেছিল, সে এখন মধ্যশিক্ষার স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। শিক্ষানীতির কাছে পাঁচ বছর হয়তো সবে শুরু। কিন্তু ওই শিশুটির কাছে এই পাঁচ বছরই তার গোটা প্রাথমিক শিক্ষাজীবন। একবার যে সময় পেরিয়ে গেল, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার পরে পৌঁছলেও তার জীবনে সেই সুযোগ দ্বিতীয়বার ফিরে আসবে না।
এই কারণেই কোনও শিক্ষানীতির প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত শুধুমাত্র সরকারি নথিতে কী লেখা রয়েছে, কিংবা স্কুলের গেটের নতুন রং কতটা ঝকঝকে, তা দিয়ে নয়। বরং দেখতে হবে, কোনও সাধারণ সকালে স্কুলের শেষ বেঞ্চে বা তৃতীয় সারিতে বসে থাকা একটি শিশু ঠিক কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে। যখন স্কুলে কোনও পরিদর্শক থাকছেন না, তখন শ্রেণিকক্ষের ভিতরে কী ঘটছে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে সস্তা সংস্কার এখনও সাইনবোর্ড বদলানো-
সেদিন সন্ধ্যায় স্কুলের গেট বন্ধ করার সময় রঘুনাথ নতুন সাইনবোর্ডটি নিয়ে কোনও আপত্তি করেননি। তাঁর মনে শুধু একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। রং মিস্ত্রি আসার আগের দিন আর পরের দিনের মধ্যে পড়ুয়ারা কি আদৌ কোনও পার্থক্য বুঝতে পারবে?
২০২০ সাল থেকে আপনার কাছের স্কুলটিতে ঠিক কী পরিবর্তন হয়েছে? শুধু স্কুলের গেটের সাইনবোর্ড, নাকি শ্রেণিকক্ষের ভিতরের প্রতিদিনের ছবিটাও বদলেছে?
তথ্যসূত্র: জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক; নিপুণ ভারত মিশন (২০২১); কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট বা CUET (২০২২), ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি; ভারতের সংবিধানের সপ্তম তফসিলের যুগ্ম তালিকা; শিক্ষা তহবিল আটকে রাখা নিয়ে তামিলনাড়ুর সুপ্রিম কোর্টে আবেদন সংক্রান্ত ২০২৫ সালের প্রতিবেদন এবং মহারাষ্ট্রে তৃতীয় ভাষা সংক্রান্ত নির্দেশ প্রত্যাহারের খবর।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনের প্রধান শিক্ষক রঘুনাথ এবং শিক্ষিকা সুনীতা কাল্পনিক চরিত্র। তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যগুলি বাস্তব।