ছটপুজো ঘিরে উদ্বেগ! রবীন্দ্র সরোবরে বিরল পাখির ভিড়

কলকাতা: শীতের আগেই বিরল প্রজাতির পাখির দেখা মিলছে রবীন্দ্র সরোবরে (Rabindra Sarobar)। রাস্টি-টেইলড ফ্লাইক্যাচার, ইন্ডিয়ান ব্লু রবিন, ব্লাইথস প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার, ক্রো-বিলড ড্রঙ্গো এবং স্কেলি থ্রাশের মতো পাখির উপস্থিতিতে খুশি কলকাতার পাখিপ্রেমীরা। তাঁদের আশা, এবারের শীতের মরশুমে সরোবরে পাখির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য আরও বাড়বে। কিন্তু এই আশার মধ্যেই পরিবেশবিদ ও বার্ডওয়াচারদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সৌন্দর্যায়নের নামে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে হস্তক্ষেপ এবং রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজোর আয়োজনের সম্ভাবনা।
পাখি পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলির মধ্যে এবারের শরৎকাল অন্যতম আশাব্যঞ্জক। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা বাড়ে। সেই সময়েই একের পর এক বিরল প্রজাতির দেখা মিলছে সরোবর এলাকায়।
উত্তর ভারত ও ইউরেশিয়া থেকে আসে পরিযায়ী পাখি
eBird-এর রিভিউয়ার এবং পাখি শনাক্তকরণ বিশেষজ্ঞ সন্দীপ বিশ্বাস জানিয়েছেন, রবীন্দ্র সরোবর পরিযায়ী পাখিদের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথের মধ্যে পড়ে। উত্তর ভারত এবং ইউরেশিয়া থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে যাওয়ার সময় বহু পাখি এই অঞ্চলের উপর দিয়ে যাতায়াত করে।
তাঁর কথায়, সরোবরে সারা বছর থাকা পাখি, স্থানীয় পরিযায়ী পাখি, শীতের অতিথি এবং যাত্রাপথে সাময়িকভাবে আসা পাখি, সব ধরনের প্রজাতির দেখা মেলে। বিশেষ করে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পাখিদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
এ বছর সরোবরের স্থায়ী পাখির তালিকাতেও নতুন সংযোজন হয়েছে। দেখা মিলেছে ব্রাউন হক আউল এবং কলার্ড স্কপস আউলের। এর মধ্যে কলার্ড স্কপস আউলকে এই প্রথম সরোবর এলাকায় দেখা গিয়েছে বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ও পাখিপ্রেমী সুদীপ ঘোষের দাবি, সম্প্রতি প্রায় ১৫টি উল্লেখযোগ্য প্রজাতির পাখির সন্ধান মিলেছে। তার মধ্যে পাঁচটি প্রজাতির দেখা এই প্রথম।
সাত বছরে বেড়েছে দ্বীপগুলিতে পাখির সংখ্যা
নিয়মিত পাখি পর্যবেক্ষকদের মতে, রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশগত উন্নতির সঙ্গে পাখির সংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সরোবরের ভিতরে বড় জমায়েতের উপর বিধিনিষেধ আরোপের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত এবং সরোবরের গাছপালার বৈচিত্র্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা দেবজিৎ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, গত সাত বছরে সরোবরের দ্বীপগুলিতে পাখির সংখ্যা বেড়েছে। পেইন্টেড স্টর্ক এবং গ্রে হেরনের সংখ্যাও আশাব্যঞ্জকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাঁর হিসাব অনুযায়ী, রবীন্দ্র সরোবরে প্রায় ১৩৫ থেকে ১৪০ ধরনের গাছ রয়েছে। এর মধ্যে বিরল পারুল গাছও রয়েছে। এই গাছপালা পাখি, পোকামাকড় এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল তৈরি করে।
সৌন্দর্যায়নের নামে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক আবাসস্থল?
পাখির সংখ্যা বাড়লেও সরোবরের পরিবেশ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেবজিৎ মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ, সাম্প্রতিক কিছু সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে।
তাঁর দাবি, পারুল গাছের কিছু চারা পরিষ্কার করার নামে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্গা মিউজিয়ামের কাছে জোনাকি পোকার আবাসস্থলও নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি পাখিদের গুরুত্বপূর্ণ বিচরণ এলাকায় রাস্তা ও পথ পরিষ্কার করতে Leaf Blower ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে শব্দদূষণ বাড়ছে এবং পাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
দেবজিতের পরামর্শ, সরোবরের অন্তত ২০ শতাংশ এলাকা প্রাকৃতিক অবস্থায় রেখে দেওয়া উচিত। বাকি অংশের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করা যেতে পারে। তাঁর মতে, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা ও গাছপালা ছাঁটার বদলে স্বাভাবিক উদ্ভিদ বৃদ্ধির সুযোগ দিলে পাখি ও পতঙ্গের সংখ্যা বাড়বে।
ছটপুজো নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন পাখিপ্রেমীরা?
রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজোর আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন পাখি পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের বক্তব্য, অতীতে সরোবরের ভিতরে বড় জমায়েত, বাজি, সাউন্ড সিস্টেম এবং ধোঁয়ার কারণে বন্যপ্রাণীদের ব্যাপক সমস্যা হয়েছিল। পুজোর উপকরণ জলে ফেলার ফলে জলদূষণও বেড়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, এর জেরে মাছ ও কচ্ছপের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছিল।
ভারতে ১,০০০-এর বেশি প্রজাতির পাখি নথিভুক্ত করেছেন অধিরূপ ঘোষ। তাঁর মতে, রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজোর আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হলে পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি একে পরিবেশের জন্য ‘মৃত্যুদণ্ড’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অধিরূপের বক্তব্য, এখনই সরোবরে পাখিদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। শীতের অতিথি পাখিরাও আসতে শুরু করেছে। এই সময়ে বড় জমায়েত বা অতিরিক্ত শব্দ হলে পাখিরা সরোবর ছেড়ে চলে যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, একবার পাখিরা এই আবাসস্থল ত্যাগ করলে তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
সাময়িকভাবে আসছে পরিযায়ী পাখিরা
আর এক পাখিপ্রেমী প্রিয়ম চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পাখির দেখা বাড়লেও অনেক পরিযায়ী প্রজাতি সরোবরে বেশিদিন থাকছে না। বিশেষ করে লায়ন্স সাফারি পার্কের ভিতরে আবাসস্থল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সেখানে Leaf Blower দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করার ফলে গুরুত্বপূর্ণ পাখির বিচরণ এলাকায় শব্দের মাত্রা বাড়ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
রবীন্দ্র সরোবরে বিরল পাখির উপস্থিতি কলকাতার পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখতে প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলদূষণ রোধ জরুরি বলে মনে করছেন পাখিপ্রেমীরা। তাঁদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত সৌন্দর্যায়ন কিংবা বড় জমায়েতের অনুমতি এই দীর্ঘদিনের পরিবেশগত উন্নতিকে আবার পিছিয়ে দিতে পারে।
The latest news from Kolkata, including traffic updates, civic issues, weather, accidents, administrative decisions, and other important information for daily life, is published in this section. Stay tuned regularly to keep up with all the latest updates from the city.