আমেরিকার আকাশে নাসার রহস্যময় সুপারসনিক উড়ান, নজর কাড়ল পেনসিল সমান নকশা!
ওয়াশিংটন: পেন্সিলের মতো সরু, লম্বা নাকের অদ্ভুত দর্শন এক সুপারসনিক জেট (NASA X 59)। আমেরিকার আকাশে এই বিমান উড়তে দেখে কৌতূহল ছড়াল সাধারণ মানুষের মধ্যে। নাসার পরীক্ষামূলক বিমান X-59 বুধবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফ্লোরিডার উদ্দেশে পাড়ি দেয়। ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর প্রথমবার আকাশে উড়েছিল বিমানটি। নাসার Quesst মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বিমান ভবিষ্যতে সুপারসনিক উড়ানের শব্দদূষণ কমানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
ফ্লোরিডার Kennedy Space Center-এর দিকে যাওয়ার পথে আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায় বিমানটিকে দেখতে পান মানুষ। তার উড়ানের একাধিক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানও X-এ একটি ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, “দারুণভাবে ক্যামেরাবন্দি হয়েছে… X-59 তার পথে এগিয়ে চলেছে NASA Kennedy-র দিকে।”
এই যাত্রায় X-59-এর সঙ্গে নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণের জন্য ছিল একটি F-15, একটি F/A-18 এবং একটি Gulfstream C-20 বিমান। নাসার অ্যারোনটিক্স বিভাগও প্রথম উড়ানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ পোস্ট করে জানায়, মাত্র এক বছরে বিমানটির উচ্চতা, গতি এবং উড়ানের অভিজ্ঞতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
এক বছরে কতটা এগোল X-59?
২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর প্রথম উড়ানে X-59 সর্বোচ্চ ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠেছিল। সেই সময় তার সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ২৩০ মাইল এবং আকাশে থাকার সময় ছিল ৬৭ মিনিট। প্রথম উড়ানের সময় বিমানটি মাত্র একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট সম্পন্ন করেছিল।
এক বছর পর, ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর নাসার প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, X-59-এর সর্বোচ্চ উড়ান উচ্চতা পৌঁছেছে ৫৬ হাজার ফুটে। সর্বোচ্চ গতি হয়েছে Mach 1.53। অর্থাৎ শব্দের গতির দেড় গুণেরও বেশি। একটানা সবচেয়ে দীর্ঘ উড়ানের সময় দাঁড়িয়েছে ১০২ মিনিট। সব মিলিয়ে বিমানটি ৪১টি পরীক্ষামূলক উড়ান সম্পন্ন করেছে।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানটি Mach 1.4 বা ঘণ্টায় প্রায় ৯২৫ মাইল গতিতে ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ওড়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে বর্তমানে পরীক্ষায় তার সর্বোচ্চ গতি Mach 1.53-এ পৌঁছেছে।
পেন্সিলের মতো সরু নাক কেন?
X-59-এর সবচেয়ে নজরকাড়া বৈশিষ্ট্য হল তার অস্বাভাবিক লম্বা ও সরু সামনের অংশ। নাসার তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির দৈর্ঘ্য ৯৯.৭ ফুট এবং প্রস্থ ২৯.৫ ফুট। এর নাকের অংশটি এতটাই লম্বা যে বিমানের মোট দৈর্ঘ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে।
এই নকশার পিছনে রয়েছে বিশেষ বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য। সাধারণ সুপারসনিক বিমান শব্দের গতির চেয়ে দ্রুত উড়লে বাতাসে প্রবল চাপতরঙ্গ তৈরি হয়। এই তরঙ্গগুলি একসঙ্গে মিশে মাটিতে পৌঁছলে তীব্র শব্দ তৈরি করে, যা Sonic Boom নামে পরিচিত। X-59-এর লম্বা ও সরু নাকের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এই চাপতরঙ্গগুলি এক জায়গায় জমাট বাঁধতে না পারে। ফলে মাটিতে পৌঁছনো শব্দের তীব্রতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিমানটির ইঞ্জিনও বিশেষভাবে বসানো হয়েছে। একটি মাত্র ইঞ্জিন রয়েছে বিমানের মূল কাঠামোর উপরের দিকে। নাসার মতে, এই অবস্থান ইঞ্জিনের শব্দকে উপরের দিকে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বিমানের মসৃণ তলদেশ চাপতরঙ্গের একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে পরিকল্পিত।
সামনে দেখার জন্য নেই প্রচলিত ককপিটের জানলা
X-59-এর ককপিটেও রয়েছে অভিনব প্রযুক্তি। সাধারণ বিমানের মতো সামনে সরাসরি দেখার জন্য প্রচলিত উইন্ডশিল্ড নেই। পরিবর্তে পাইলটরা ব্যবহার করেন NASA External Vision System। একাধিক ক্যামেরা এবং উচ্চ রেজোলিউশনের ডিসপ্লের সাহায্যে বিমানের সামনের ও নিচের অংশের দৃশ্য ককপিটে তুলে ধরা হয়।
এই ব্যবস্থার ফলে লম্বা নাকের কারণে পাইলটের সামনে সরাসরি দৃশ্য দেখার সমস্যা সামলানো সম্ভব হয়েছে। বিমানটির প্রথম উড়ান পরিচালনা করেছিলেন পরীক্ষামূলক পাইলট নিলস লারসন। ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার পামডেলের Lockheed Martin Skunk Works কারখানা এলাকা থেকে উড়ে বিমানটি নাসার Armstrong Flight Research Center-এ পৌঁছেছিল। প্রথম উড়ানে মূলত কম গতি ও কম উচ্চতায় বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয়েছিল।
As you may have noticed, NASA is my first love when it comes to aviation, and that will always be true. So catching the X-59 QueSST at NAS JRB Fort Worth today is something extremely special. This is my first time catching an X-plane!
The X-59 is an experimental aircraft developed by Lockheed Martin Skunk Works for NASA to test quiet sonic booms. It completed its first flight on October 28, 2025, making today the one-year anniversary of its first flight. How fitting to catch it on such a special day!
@rookisaacman @NASAAdmin @LockheedMartin
— Tori Mae Fontana (@LensOfMae) October 28, 2026
বাণিজ্যিক সুপারসনিক উড়ানের ভবিষ্যৎ কী?
X-59 কোনও যাত্রীবাহী বিমানের প্রোটোটাইপ নয়। এতে কখনও যাত্রী পরিবহণ করা হবে না। এটি সম্পূর্ণ পরীক্ষামূলক গবেষণা বিমান। এর মাধ্যমে সুপারসনিক গতিতে উড়লে কী ধরনের শব্দ তৈরি হয় এবং সেই শব্দ মাটিতে বসবাসকারী মানুষের কাছে কতটা বিরক্তিকর হয়ে ওঠে, তা পরিমাপ করবে নাসা।
পরবর্তী পর্যায়ে শুরু হবে Acoustic Validation বা শব্দসংক্রান্ত পরীক্ষা। আমেরিকার নির্বাচিত কিছু জনবসতির উপর দিয়ে X-59 উড়িয়ে শব্দের মাত্রা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করা হবে। এই পরীক্ষার ফলাফল ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে সুপারসনিক বিমান চলাচলের শব্দ সংক্রান্ত নিয়ম নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে।
বর্তমানে স্থলভাগের উপর দিয়ে বাণিজ্যিক সুপারসনিক উড়ানের ক্ষেত্রে শব্দদূষণ একটি বড় বাধা। নাসার আশা, X-59-এর পরীক্ষায় সংগৃহীত তথ্য প্রমাণ করতে পারবে যে সুপারসনিক গতিতে উড়েও শব্দের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেই সম্ভাবনা বাস্তব হলে ভবিষ্যতে স্থলভাগের উপর দিয়ে দ্রুতগতির বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের নিয়মে পরিবর্তনের পথ খুলতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পরীক্ষার ফলাফল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির মূল্যায়নের উপর।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।