কৃষকের অ্যাকাউন্টে ২,০০০ টাকা পৌঁছয় কীভাবে? জানুন আট ধাপের প্রক্রিয়া
নয়াদিল্লি: প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি (PM-KISAN) প্রকল্পের ২৪তম কিস্তিতে শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, দেশের ৯.৩৪ কোটিরও বেশি কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৮,৬৯০ কোটি টাকা পাঠাল কেন্দ্র। গুজরাতের বানাসকাঁথায় একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) পদ্ধতিতে এই টাকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সরকারি কোষাগার থেকে কীভাবে সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছয় এই অর্থ? টাকা পাঠানোর আগে কী কী যাচাই করা হয়? এই পুরো প্রক্রিয়ায় রয়েছে একাধিক ধাপ।
কৃষকের নাম নথিভুক্ত করা থেকে শুরু করে জমির নথি যাচাই, আধার সংযুক্তিকরণ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা এবং রাজ্য সরকারের অনুমোদন, প্রতিটি পর্যায় পেরিয়ে তবেই চূড়ান্ত অর্থ পাঠানো হয়। এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় পাবলিক ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (PFMS), ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্ক এবং ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (NPCI)। কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত মোট বিতরণের পরিমাণ ৪.৬৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
কীভাবে কৃষকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছয় পিএম কিষানের টাকা?
পিএম কিষান প্রকল্পে টাকা পাঠানোর আগে একাধিক ধাপে যাচাই করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত আটটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়।
১. কৃষকের নাম নথিভুক্তকরণ: যোগ্য কৃষকরা পিএম কিষান পোর্টাল, মোবাইল অ্যাপ অথবা কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC)-এর মাধ্যমে নাম নথিভুক্ত করতে পারেন। এর জন্য ব্যক্তিগত তথ্য, জমির বিবরণ এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য জমা দিতে হয়।
২. রাজ্য স্তরে তথ্য যাচাই: কৃষকের জমা দেওয়া তথ্য যাচাই করে রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির প্রশাসন। কোন কৃষক পরিবার প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট তথ্য পোর্টালে আপলোড করা হয়।
৩. আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাই: আধার নম্বর এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য পরীক্ষা করে দেখা হয়। একই ব্যক্তির নামে একাধিক নথিভুক্তি বা অযোগ্য ব্যক্তির নাম রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি পিএম কিষান পোর্টালে জমির রেকর্ড সংযুক্ত থাকা প্রয়োজন।
৪. PFMS-এর মাধ্যমে যাচাই: রাজ্য সরকারের অনুমোদনের পর উপভোক্তাদের তথ্য পাঠানো হয় পাবলিক ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে। সেখানে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বৈধতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হয়।
৫. পেমেন্টের নির্দেশ তৈরি: সমস্ত তথ্য সঠিক বলে প্রমাণিত হলে যোগ্য কৃষকদের জন্য অর্থ পাঠানোর অনুরোধ এবং পেমেন্ট অর্ডার তৈরি করা হয়।
৬. অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন: কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দফতর প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিয়ে অর্থ বিতরণের নির্দেশ জারি করে।
৭. ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ: এরপর স্পনসর ব্যাঙ্ক এবং NPCI-এর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
৮. সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা: সব ধাপ সম্পন্ন হলে DBT ব্যবস্থার মাধ্যমে অনুমোদিত অর্থ সরাসরি কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে। মাঝখানে কোনও দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয় না।
পিএম কিষান প্রকল্পে বছরে কত টাকা পাওয়া যায়?
২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি চালু হয়েছিল পিএম কিষান প্রকল্প। এটি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রকল্প, যার মাধ্যমে দেশের যোগ্য জমির মালিক কৃষক পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পে প্রতিটি যোগ্য কৃষক পরিবার বছরে মোট ৬,০০০ টাকা পায়। তিনটি সমান কিস্তিতে ২,০০০ টাকা করে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।
কৃষিকাজের বিভিন্ন খরচ, যেমন বীজ, সার, সেচের সরঞ্জাম এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে এই অর্থ সহায়তা করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রকের বক্তব্য, এই আর্থিক সহায়তা কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, অনানুষ্ঠানিক ঋণের উপর নির্ভরতা কমাতে এবং গ্রামীণ পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে সাহায্য করে।
তবে প্রকল্পের সুবিধা পেতে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। কৃষকের জমির রেকর্ড পোর্টালে সংযুক্ত থাকতে হবে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার লিঙ্ক করতে হবে এবং e-KYC সম্পূর্ণ করতে হবে।
কারা ঠিক করেন কোন কৃষক এই সুবিধা পাবেন?
পিএম কিষান প্রকল্পে যোগ্য কৃষক পরিবার চিহ্নিত করার দায়িত্ব রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির প্রশাসনের। তারাই উপভোক্তাদের তথ্য সংগ্রহ করে এবং তালিকা নিয়মিত আপডেট করে।
এই ডেটাবেসে কৃষকের নাম, বয়স, শ্রেণি, আধার নম্বর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ এবং মোবাইল নম্বরের মতো তথ্য থাকে। একই ব্যক্তির নামে একাধিকবার সুবিধা চলে যাওয়া বা অযোগ্য ব্যক্তির নাম তালিকায় থেকে যাওয়া আটকাতে তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাই করা হয়।
স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গ্রামের স্তরেও উপভোক্তাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। কোনও যোগ্য কৃষকের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে তিনি নির্দিষ্ট অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন জানাতে পারেন।
অন্যদিকে, অযোগ্য ব্যক্তিরা প্রকল্পের টাকা পেয়ে থাকলে তাঁদের কাছ থেকে সেই অর্থ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। আয়করদাতা, সরকারি কর্মচারী, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার (PSU) কর্মী এবং সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী এই সুবিধার আওতার বাইরে।
কৃষি মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে অযোগ্য উপভোক্তাদের কাছ থেকে মোট ৪১৬.৭৫ কোটি টাকা ফেরত নেওয়া হয়েছিল।
কীভাবে সম্পূর্ণ করবেন পিএম কিষান e-KYC?
পিএম কিষান প্রকল্পে উপভোক্তার পরিচয় নিশ্চিত করতে আধার-ভিত্তিক e-KYC অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা তিনটি পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন।
- OTP-ভিত্তিক যাচাই: আধারের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বরে আসা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই।
- বায়োমেট্রিক যাচাই: নির্দিষ্ট পরিষেবা কেন্দ্রে আঙুলের ছাপের মতো বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করা।
- ফেস অথেনটিকেশন: মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মুখের ছবি স্ক্যান করে পরিচয় যাচাই।
২০২৩ সালে পিএম কিষান মোবাইল অ্যাপে ফেস অথেনটিকেশন সুবিধা চালু করা হয়েছিল। এর ফলে OTP বা আঙুলের ছাপ ছাড়াই কৃষকরা নিজেদের পরিচয় যাচাই করতে পারেন।
পোর্টাল, অ্যাপ ও AI চ্যাটবটেও মিলবে পরিষেবা
পিএম কিষান পোর্টালই এই প্রকল্পের মূল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কৃষকের নাম নথিভুক্ত করা, তথ্য যাচাই এবং উপভোক্তাদের ডেটাবেস পরিচালনার কাজ হয় এই পোর্টালের মাধ্যমে। অর্থ পাঠানোর জন্য PFMS-এর সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে এটি।
২০২০ সালে চালু হওয়া পিএম কিষান মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও কৃষকরা নিজে নাম নথিভুক্ত করতে পারেন। পাশাপাশি পেমেন্টের অবস্থা দেখা এবং e-KYC সম্পন্ন করার সুবিধাও রয়েছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পের ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয় ‘কিষান-ইমিত্র’ (Kisan-eMitra) নামে AI-ভিত্তিক চ্যাটবট। EkStep Foundation এবং BHASHINI-এর প্রযুক্তিগত সহায়তায় তৈরি এই পরিষেবার মাধ্যমে কৃষকরা রেজিস্ট্রেশন, টাকা পাঠানোর অবস্থা এবং প্রকল্পের যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারেন।
এই চ্যাটবট ১১টি ভাষায় পরিষেবা দেয়। ভাষাগুলি হল বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, তামিল, ওড়িয়া, মালয়ালম, গুজরাতি, পাঞ্জাবি, তেলুগু, মারাঠি এবং কন্নড়। ভয়েস ও টেক্সট, দুই মাধ্যমেই প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকরা দিনের যে কোনও সময়ে নিজেদের আবেদন এবং পেমেন্টের আপডেট জানতে পারেন।
পিএম কিষান প্রকল্পে বরাদ্দ কত?
২০২৬ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবর্ষ পর্যন্ত পিএম কিষান প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। এই সময়ের জন্য মোট ৩.১৫ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য আলাদা করে ৬০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রকের মতে, কৃষকদের কৃষি উপকরণ কেনার জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং চাষের কাজে অর্থের জোগান নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। ডিজিটাল যাচাই ও DBT ব্যবস্থার মাধ্যমে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্র।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business