হামিদুলের কেস খুলছে, কড়া হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর
এই সময়: একই দিনে দুই প্রশাসনিক পদক্ষেপ। নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো বীরভূমের হাসনের বিধায়ক কাজল শেখের। আবার উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমানের বিরুদ্ধে পুরোনো মামলা রি–ওপেন করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কাজলের নিরাপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজে বা প্রশাসনের কোনও কর্তা মন্তব্য করেননি। তবে বৃহস্পতিবার উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন, উত্তর দিনাজপুরের চা–বলয়ে যত জমি বেদখল হয়েছে, তা উদ্ধার করতে হবে।
হামিদুলকে সরাসরি ‘মাফিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করে শুভেন্দু বলেন, ‘আমি ইসলামপুরের এসপি এবং ডিআইজি, আইজিকে বলে গেলাম— চোপড়ার কুখ্যাত গুন্ডা–মাফিয়া বিধায়কের বিরুদ্ধে যত মামলা রয়েছে, তা রি–ওপেন করবেন। দেখতে চাই, কত বড় মস্তান এই জেলায় আছে। কত বড় বালি চোর, মাফিয়া আছে।’ ২০২১–এর বিধানসভা ভোট এবং ২০২৩–এর পঞ্চায়েত ভোটে যাঁদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ দায়ের হলে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের মতো তাঁদেরও জেলে ঢোকানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শুভেন্দু।
এর আগের ঘটনাপরম্পরার প্রেক্ষিতে এই দুই প্রশাসনিক নির্দেশকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। বুধবার বিধানসভায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘মমতা তৃণমূলে’র কক্ষে গিয়ে বিজয়ার মিষ্টিমুখ করে কাজল শেখ প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে তিনি স্বাক্ষর করলেও মমতাই তাঁর নেত্রী। আবার দিন কয়েক আগে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূলে’র মায়া কাটিয়ে তিনি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকছেন, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন হামিদুল। এই দুইয়ের জেরে ‘মমতা তৃণমূলে’র অভিযোগ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি এই বিধায়করা আস্থা জ্ঞাপন করতেই রাজ্য সরকার এই পদক্ষেপ করছে।
এ দিন রায়গঞ্জে শুভেন্দু জানান, উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া প্রভৃতি এলাকায় সরকারের খাস জমি, চা–বাগানের জমি, আদিবাসীদের জমি বেদখল হয়েছে। ২০২৬–এর বিধানসভা ভোটে এই বিধানসভাগুলিতে জোড়াফুলের বিধায়করাই জয়ী হয়েছিলেন। এঁদের কেউ কেউ এখন ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে রয়েছেন, কেউ কেউ প্রথম থেকে কালীঘাটের পাশে আছেন। হামিদুল, চাকুলিয়ার বিধায়ক মিনহাজ আফরিন আজ়াদের মতো কয়েকজন হালে ঋতব্রত শিবির থেকে মমতার দিকে ফিরে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
এই আবহে এ দিন রায়গঞ্জে শুভেন্দু বলেন, ‘এডিএম–কে (ল্যান্ড) বলেছি, তৃণমূলের ১৫ বছর এবং বামফ্রন্ট আমলে আদিবাসী, সনাতনীদের যে জমি বেদখল হয়েছে সব উদ্ধার করতে। যেখানে সরকারি খাস জমিতে অবৈধ নির্মাণ হয়েছে, তা চিহ্নিত করে ভেঙে পরিষ্কার করতে। চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়াতে চা বাগানের যত জমি জোর করে বেদখল হয়েছে, সব উদ্ধার করতে হবে।’
মুখ্যমন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারি নিয়ে চোপড়ার পাঁচ বারের বিধায়ক হামিদুল বলেন, ‘ওঁরা এখন ক্ষমতায় রয়েছেন, তাই গ্রেপ্তার করতেই পারেন। কিন্তু আমার নামে কোনও মামলা নেই। আমি মমতাদির শিবিরে ফিরে গিয়েছি বলে (উনি) এই কথা বলেছেন।’ চোপড়ার বিধায়কের পথে হাঁটছেন চাকুলিয়ার বিধায়ক মিনহাজ আফরিন আজ়াদ। কালীঘাট শিবিরের হাত শক্ত করে এ দিন তিনি বলেছেন, ‘ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করার জন্য সই করেছিলাম। কিন্তু মমতাদির সঙ্গে শুরু থেকে রয়েছি। অভিষেকের উপরে যখন হামলা হয়েছিল, তখনও আমি প্রতিবাদে মিছিল করেছি।’
বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী রায়গঞ্জের সভায় যখন হামিদুলকে নিশানা করছেন, তার কাছাকাছি সময়ে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূলে’র আর এক বেসুরো বিধায়ক কাজল শেখের নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যাহার করা হয়। এর পাশাপাশি এ দিন সন্ধেয় বীরভূমের হাসনের বিধায়কের নানুরের বাড়িতে যায় পুলিশের একটি টিম। তাঁর ভাইপোর বাড়ি থেকে এ দিন বেশকিছু আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। নিরাপত্তারক্ষী ফেরত চেয়ে আদালতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন কাজল। এ দিন বিধানসভার স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে এসে কাজল তাঁর দুই নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যাহারের বিষয়টি জানান। এ নিয়ে বিরোধী সচেতক আখরুজ্জামানের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়।
হাসনের বিধায়কের কথায়, ‘শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বর্ষীয়ান মানুষ। তাঁকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে মিষ্টি খাওয়া যদি অন্যায় হয়, তা হলে এই অন্যায় আমি বারবার করব। ২০২১ থেকে আমার নিরাপত্তারক্ষী ছিল। বাম আমলে আমার দাদা ও বাবাকে আমি হারিয়েছি। আমি আদালতেরও দ্বারস্থ হব।’
কাজলের অভিযোগ, অতীতে তাঁর উপরে হামলা চালাতে বাংলাদেশ থেকে শুটার নিয়ে আসা হয়েছিল। সেই শুটার গ্রেপ্তার হয়ে সিওয়ান জেলে থাকলেও এই চক্রান্তের নেপথ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা এখনও বোলপুর এলাকায় ঘোরাফেরা করছেন বলে কাজলের দাবি। নিরাপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে বিধানসভার অধ্যক্ষের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন আখরুজ্জামান। বিরোধী সচেতকের বক্তব্য, ‘প্রত্যেক বিধায়ককে সরকারের পক্ষ থেকে এক অথবা দু’জন নিরাপত্তারক্ষী দেওয়া হয়। প্রতিটি বিধায়কের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। কাজল শেখের এই বিষয়টি স্পিকারকে লিখতে বলব।’
হামিদুল মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় পড়ায় এবং কাজলের নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যাহার হওয়ায় ‘মমতা তৃণমূলে’র সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিন বলেন, ‘এক জন বিধায়ক মমতাকে সমর্থন করায় তাঁর ফাইল খোলার কথা বলা হয়েছে। আগে নিজেদের ফাইল খুলুন। কাজল শেখ মমতাকে সমর্থন করেছেন বলে তাঁর বাড়িতে তাণ্ডব করা হয়েছে। যদি কেউ দুর্নীতি, অপরাধে যক্ত থাকেন, দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা হোক। কিন্তু সিলেক্টিভলি নিশানা করা হচ্ছে!’