মহাকাশে চিনের লেজার অস্ত্রের আশঙ্কা, বিপদে মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইট
মুম্বই: যুদ্ধের ময়দানে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার (Space Weapons) আগেই যদি প্রতিপক্ষের চোখ অন্ধ করে দেওয়া যায়, তাহলে বদলে যেতে পারে আধুনিক যুদ্ধের সমীকরণ। মহাকাশে থাকা শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইটকে লক্ষ্য করে এমনই প্রযুক্তি তৈরির পথে এগোতে পারে চিন। মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (DIA)-র একটি নতুন রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ২০২০-এর দশকের শেষের দিকে চিন মহাকাশভিত্তিক নির্দেশিত-শক্তির অস্ত্র (Directed-Energy Weapons) মোতায়েন করতে পারে। এই প্রযুক্তি কার্যকর হলে মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইটের সেন্সর অকার্যকর করা, যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানো কিংবা সংবেদনশীল যন্ত্রাংশের ক্ষতি করার সক্ষমতা বাড়তে পারে চিনের।
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত Challenges to Security in Space শীর্ষক রিপোর্টে চিনের ক্রমবর্ধমান মহাকাশবিরোধী সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে DIA। তবে রিপোর্টে স্পষ্ট করা হয়েছে, মহাকাশে এই ধরনের অস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাব্য সময়সীমা হিসেবে ২০২০-এর দশকের শেষভাগের কথা বলা হলেও, সেগুলি ইতিমধ্যেই কক্ষপথে কার্যকর অবস্থায় রয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়নি।
কী এই মহাকাশভিত্তিক লেজার অস্ত্র?
নির্দেশিত-শক্তির অস্ত্র এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে উচ্চক্ষমতার লেজার বা শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভের মতো কেন্দ্রীভূত শক্তি ব্যবহার করে কোনও লক্ষ্যবস্তুকে ব্যাহত, অকার্যকর বা ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়। প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করাই এই প্রযুক্তির একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।
মহাকাশযুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে স্যাটেলাইটের অপটিক্যাল সেন্সর সাময়িকভাবে অন্ধ করে দেওয়া, ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা কিংবা সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। স্যাটেলাইটের সেন্সর অকার্যকর হলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ছবি সংগ্রহ, নজরদারি এবং সামরিক তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
প্রচলিত অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত সরাসরি আঘাত করে লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করে। এর ফলে কক্ষপথে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, নির্দেশিত-শক্তির অস্ত্র নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সরাসরি সংঘর্ষ ছাড়াই স্যাটেলাইটের কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে পারে। তবে অস্ত্রের ক্ষমতা, লক্ষ্যবস্তুর দূরত্ব, নিশানার নির্ভুলতা এবং স্যাটেলাইটের প্রযুক্তিগত সুরক্ষার উপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করে।
চিনের মহাকাশবিরোধী অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে উদ্বেগ
DIA-র রিপোর্ট অনুযায়ী, চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) মহাকাশে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা নষ্ট করার জন্য একাধিক প্রযুক্তির উপর কাজ করছে। নির্দেশিত-শক্তির অস্ত্রের পাশাপাশি অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং কক্ষপথে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম মহাকাশযানও এই কৌশলের অংশ হতে পারে।
রিপোর্টে আরও সতর্ক করা হয়েছে, চিন এমন উন্নত স্থলভিত্তিক ব্যবস্থাও তৈরি করছে, যা আরও উঁচু কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য বিপদ শুধু মহাকাশে মোতায়েন করা অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর উপরিভাগ থেকে পরিচালিত প্রযুক্তিও সামরিক স্যাটেলাইটের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
DIA-র মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চিন এবং রাশিয়া নতুন ও উন্নত মহাকাশবিরোধী সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাবে। সংস্থাটির মতে, মহাকাশভিত্তিক সম্পদের উপর আমেরিকা ও তার মিত্রদের নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগানোর কৌশল এই প্রচেষ্টার অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে রিপোর্টের এই মূল্যায়ন সম্ভাব্য সামরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণ। এটি চিনের মহাকাশভিত্তিক লেজার অস্ত্র ইতিমধ্যেই কার্যকরভাবে মোতায়েন থাকার প্রমাণ নয়।
আধুনিক যুদ্ধে স্যাটেলাইট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমান সামরিক অভিযানে স্যাটেলাইট শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং গোটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দূরবর্তী সেনা ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা, শত্রুপক্ষের গতিবিধি নজরে রাখা, নির্ভুল আঘাত হানার জন্য তথ্য সরবরাহ করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
GPS-এর মতো উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা সামরিক বিমান, যুদ্ধজাহাজ, স্থলবাহিনী এবং নির্ভুল নিশানাভিত্তিক অস্ত্রকে অবস্থান, দিকনির্দেশ ও সময় সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করে। এই পরিষেবা ব্যাহত হলে বাহিনীর চলাচল, সমন্বয় এবং অস্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, নজরদারি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সেনা মোতায়েন, নৌবাহিনীর গতিবিধি এবং সামরিক পরিকাঠামোর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। সুরক্ষিত স্যাটেলাইট যোগাযোগের সাহায্যে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সেনা ইউনিটের সঙ্গে দ্রুত তথ্য আদানপ্রদান করতে পারেন সামরিক কমান্ডাররা।
ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থাতেও স্যাটেলাইটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সঙ্গে যুক্ত তাপীয় সংকেত শনাক্ত করে প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এই সক্ষমতা ব্যাহত হলে সম্ভাব্য হামলা শনাক্ত করতে দেরি হতে পারে এবং পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাত হলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্বজুড়ে সামরিক অভিযানে মহাকাশভিত্তিক পরিকাঠামোর উপর আমেরিকার নির্ভরতা যথেষ্ট বেশি। ফলে চিনের মহাকাশবিরোধী সক্ষমতা বাড়লে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় তার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য কোনও সামরিক সঙ্কটে স্যাটেলাইট পরিষেবা ব্যাহত হলে মার্কিন বাহিনীর যোগাযোগ, নজরদারি এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের কাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে কোন স্যাটেলাইটকে লক্ষ্য করা হচ্ছে, কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিকল্প ব্যবস্থা কতটা কার্যকর রয়েছে, তার উপর।
মহাকাশকে কেন্দ্র করে সামরিক প্রতিযোগিতা ক্রমশ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। চিনের সম্ভাব্য লেজার অস্ত্র, অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে DIA-র সতর্কবার্তা সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ২০২০-এর দশকের শেষভাগে এই অস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাবনা থাকলেও, তার কার্যকারিতা এবং বাস্তব সামরিক প্রভাব সম্পর্কে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।