দিন-বদলের পালা এল, ঝোড়ো যুগের মাঝে? - 24 Ghanta Bangla News
Home

দিন-বদলের পালা এল, ঝোড়ো যুগের মাঝে?

Spread the love

আগামী দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি কী চেহারা নেবে, তা বলার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু ব্রাজ়িল-এ লুলা-র চমকপ্রদ জয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই পরিবর্তন যে দীর্ঘমেয়াদি, তা নিশ্চিত। লিখছেন শুভময় মৈত্র

ব্রাজ়িল-এ লুইজ় ইনাসিও লুলা দা সিলভা-র জয়ের বিভিন্ন কারণ আছে, যার মধ্যে সমাজমাধ্যমে অল্প কয়েক দিনের প্রচারের বিষয়টি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। প্রথম দফার নির্বাচনে লুলা পিছিয়ে ছিলেন এবং দ্বিতীয় দফায় জিতেছেন। আর ফলাফলের পর থেকে নজরে পড়ছে গোটা বিশ্বে বামপন্থীদের উল্লাস। এর সঙ্গে আবার সার্বিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইজ়রায়েল-এ যা ঘটছে, তাতেও দক্ষিণপন্থা খুব স্বস্তিতে, এ কথা বলা যাবে না।

প্রথমে সার্বিয়ার বিষয়টি এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ভেঙে ১৬ জনের মৃত্যুর পর দুর্নীতি ও প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগে যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের চাপে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী মিলোশ ভুচিচ পদত্যাগ করলেও প্রতিবাদ থামেনি। সদ্যসমাপ্ত ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে ছাত্র-সমর্থিত প্রার্থীরা ৫২.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বলে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন ক্ষমতাসীন আলেকজান্ডার ভুচিচ শিবির পেয়েছে মাত্র ৩৯.২ শতাংশ ভোট! অর্থাৎ এই ছাত্র আন্দোলন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলে পরিবর্তনের পথ খুলে দিয়েছে।

একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে কথা বলছে
নিজস্ব ছবি

অন্য দিকে, আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর রিপাবলিকান দল বর্তমানে আইনসভার দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষা ও নির্বাচনী বিশ্লেষণে কংগ্রেস-এ ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে হচ্ছে। তবে সেনেট-এর ক্ষেত্রে ছবিটি অনেক বেশি অনিশ্চিত— ৪৮ শতাংশ মনে করছে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে, আর ৪৬ শতাংশের ধারণা ডেমোক্র্যাটরা তা ছিনিয়ে নিতে পারে। ট্রাম্প-এর দল যদি দুই কক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে সে ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক ধারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কিছুটা ধাক্কা খেতে পারে। এই লেখার সময় পর্যন্ত যা খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে ইজ়রায়েল-এর নির্বাচনেও দক্ষিণপন্থীরা খুব একটা সুবিধের জায়গায় নেই।

এ বার সরাসরি ব্রাজ়িল-এর পরিসংখ্যানে ফেরা যাক। প্রথম দফায় এগিয়ে ছিলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো-র পুত্র ফ্লাভিও। ৪ অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৪৭.০৩ শতাংশ বৈধ ভোট, আর লুইজ় ইনাসিও লুলা দা সিলভা-র জুটেছিল ৪৫.১৬ শতাংশ। ভোটের সংখ্যায় ফ্লাভিও পেয়েছিলেন ৫ কোটি ৬১ লক্ষের কিছু বেশি, লুলা-র ঝোলায় প্রায় ৫ কোটি ৩৯ লক্ষ। ব্যবধান ছিল ২২ লক্ষের কিছু বেশি। ব্রাজ়িল-এর নিয়ম অনুসারে, কেউই বৈধ ভোটের অর্ধেকের বেশি না পাওয়ায় নির্বাচন গড়ায় দ্বিতীয় দফায়।

২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে ছবিটা বদলে গেল। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার ঝড় সামলে ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হলেন লুলা। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও-র ঝুলিতে ৪৮.২১ শতাংশ। ভোটের সংখ্যায় লুলা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লক্ষের বেশি, ফ্লাভিও প্রায় ৫ কোটি ৯৮ লক্ষ। অর্থাৎ, দ্বিতীয় দফায় লুলা জিতেছেন প্রায় ৪৪ লক্ষ ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। লুলার এই প্রত্যাবর্তনে প্রদত্ত ভোটের শতাংশ বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দফায় ভোট দিতে এসেছিলেন প্রায় ১২ কোটি ৫৩ লক্ষ ভোটার, দ্বিতীয় দফায় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি ৮২ লক্ষ। অর্থাৎ, দ্বিতীয় দফায় অতিরিক্ত সাড়ে ঊনত্রিশ লক্ষের বেশি মতদাতা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

ভোটদানের হার প্রথম দফার প্রায় ৭৮.৯২ শতাংশ থেকে বেড়ে দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৮০.৮ শতাংশ। তবে এই অতিরিক্ত ভোটারদের বেশির ভাগ লুলা-কে ভোট দিয়েছেন কি না, সেটা এক কথায় বলা যাবে না, যদিও সেই প্রবণতা আছে। এটাও মাথায় রাখতে হবে যে দ্বিতীয় দফায় ভোটারদের হাতে প্রার্থী ছিলেন মাত্র দু’জন, প্রথম দফায় বারো। মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াও বাকি তিন প্রার্থী প্রথম দফায় দুই শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন, যাঁদের মোট প্রাপ্ত শতাংশ সাতেরও বেশি। অর্থাৎ অন্যান্য প্রার্থীদের বেশ কিছু ভোটারও নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবু ভোটদানের হার বৃদ্ধি এবং দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের পরিবর্তন, দু’টিই এই নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

পরিসংখ্যান ছেড়ে এ বার রাজনৈতিক আলোচনার দিকে নজর রাখা যাক। লুলা আবার জিতে যাওয়ায় বিশ্ব-রাজনীতিতে একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এল— সাম্প্রতিক সময়ে গোটা বিশ্বের সংসদীয় ব্যবস্থায় দক্ষিণপন্থার যে উত্থানকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হচ্ছিল, তার কি সত্যিই কোনও বিকল্প তৈরি হচ্ছে? স্বাভাবিক ভাবেই বামমনস্ক মানুষেরা এই ফলাফলকে বামপন্থী রাজনীতির জয় হিসেবে দেখছেন। এর একটি বড় কারণ, লুলা-র প্রতিপক্ষ শুধু একজন দক্ষিণপন্থী প্রার্থী ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর পুত্র। বাবা বলসোনারো-র রাজনৈতিক উত্থানে দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদ, রক্ষণশীল সামাজিক মূল্যবোধ, কঠোর শাসনের প্রতিশ্রুতি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তাঁর পুত্র ফ্লাভিও সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েই নির্বাচনে নেমেছিলেন।

অন্য দিকে, লুলা শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতা, যাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। শোনা যায় ১৯৬৪ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটি হারান। এর আগেও তিনি একাধিক বার নির্বাচনে জিতেছেন, কিন্তু সমাজ মাধ্যমে এই আঙুল-হারানোর বিষয়টি সে ভাবে প্রচারে আসেনি। এই প্রচারের কথায় একটু পরেই আরও বিস্তারিত ভাবে আসছি।

এ বারের এই নির্বাচনের আন্তর্জাতিক তাৎপর্যও যথেষ্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং ব্রাজ়িল-এর রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাবের প্রশ্ন নির্বাচনী আলোচনাকে বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফ্লাভিও বলসোনারোও সেই আন্তর্জাতিক দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে লুলা-র জয়কে শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ পালাবদল ছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ বারে আসা যাক প্রচারের ধারায়। ইন্টারনেট আর সমাজ মাধ্যমের বিস্তারের পর বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রচার এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বার্তা, আবেগকে উসকে দেওয়া ভাষা, প্রতিপক্ষকে বেলাগাম আক্রমণ এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে সমর্থকদের সংগঠিত করা— এই কৌশলগুলি বহু দেশে নির্বাচনী রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে। দক্ষিণপন্থী দলগুলি এই নতুন মাধ্যমকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে, এমন ধারণার যথেষ্ট ভিত্তি আছে। কিন্তু ব্রাজ়িল-এর নির্বাচনে দেখা গেল, সমাজ মাধ্যমের ব্যবহার একচেটিয়া ভাবে কোনও একটি রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে মিশে থাকে না। এই প্রসঙ্গেই প্রথম দফার ফল প্রকাশের পর লুলা-র প্রচার কৌশলে যে পরিবর্তনগুলি ঘটেছিল, সেগুলি বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়।

ফ্লাভিও-র তুলনায় পিছিয়ে থাকার পর লুলা শিবির বুঝেছিল শুধু বড় জনসভা, টেলিভিশনের বক্তব্য কিংবা দীর্ঘ রাজনৈতিক ভাষণের উপর নির্ভর করলে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছনো কঠিন। দ্বিতীয় দফায় লুলা সমাজমাধ্যমে আরও অনানুষ্ঠানিক সাদামাটা ভঙ্গিতে যোগাযোগ শুরু করেন। নিজের হাতে ধরা মোবাইলে তোলা ছোট ভিডিয়োতে সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে কথা বলেন। তাঁর প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস, যিনি হোয়াটসঅ্যাপ-এ ‘লুলার বাহিনী’ নামে একটি গ্রুপ বানিয়ে ফেলেন।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যে এই গোষ্ঠীতে এক কোটিরও বেশি মানুষ যুক্ত হয়। তাদের মধ্যে দিয়েই লুলা-র পক্ষে ব্যাপক প্রচার এবং সমাজমাধ্যমে সক্রিয়তা বাড়ে অনেকটা। মনে করা হচ্ছে যে সমাজ মাধ্যমের যোগাযোগের ভিত্তিতেই বিভিন্ন শহরে ছাত্র আর সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা অনেক দ্রুততা এবং দক্ষতার সঙ্গে সমাবেশ ও প্রচারের আয়োজন করতে সমর্থ হয়। লুলা-র প্রচারও দ্বিতীয় দফার আগে নিজেদের দুর্বলতা বুঝে বার্তার ধরন বদলেছিল— মূলত সামনে আনা হয়েছিল দক্ষিণপন্থী শাসনে সামাজিক প্রকল্প আর নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগকে।

সব শেষে কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, অন্যান্য রাজ্য এবং দেশ নিয়ে আলোচনায় না ফিরলে তরকারিতে নুন বাদ যাবে। সামনেই কলকাতা পুরনির্বাচন। সেখানে কেন্দ্র এবং রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি-র অন্যান্য দলকে খুব বেশি লড়াইয়ের জায়গা দেওয়ার কথা নয়। তবে বিজেপি-র বিরুদ্ধে বামপন্থী, কংগ্রেস এবং তৃণমূলের মমতাপন্থী অংশ এক জায়গায় আসার একটা চেষ্টা করছে। মাঠে ময়দানে এবং একই সঙ্গে সমাজমাধ্যমে তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা দেখার। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের একটা অঙ্ক বলছে কলকাতায় পুরোনো হিসেবে ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি-র দখলে আছে ১০৪টি আসন, আর পুনর্বিন্যাসের পর ২০৯টির মধ্যে ১৫৯টি। সেই সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দুই যুযুধান পক্ষ লুলা-র প্রচার থেকে কোনও শিক্ষা নেবে কি না, তা দেখার।

সামনে উত্তরপ্রদেশেও বিধানসভা নির্বাচন। নিঃসন্দেহে গ্রামীণ অঞ্চলে সমাজ মাধ্যমের প্রচার কী ভাবে প্রভাব ফেলে, সেই এক্সপেরিমেন্ট এ বার সব দলই করবে। বিজেপি-র তৃতীয় ইনিংসে যেটুকু প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি। বিজেপি-র দীর্ঘমেয়াদি সমাজ মাধ্যম-ভিত্তিক যে সংগঠিত শক্তি, তার সঙ্গে অনেকটাই লড়াইয়ের জায়গায় পৌঁছেছে পতঙ্গকুল। আর এখানেই যে প্রশ্নটা সামনে আসছে, তা হলো— সত্যিই কি মাঠে ময়দানের রাজনীতিকে চালনা করতে গেলে আগে সমাজমাধ্যমকে তার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতেই হবে? সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ‘লুলা’বাই (ঘুমপাড়ানি গান) অন্তর্জালেই গুনগুন করবে?

লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইন্সটিটিউট, কলকাতায় শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *