সিনেম্যাটিক লিবার্টি নাকি অনধিকার চর্চা?
সানি দেওল অভিনীত ‘সূর্য’ ঘিরে তরজা। চিকিৎসক ও মেডিক্যাল সম্প্রদায়কে নেতিবাচক ভাবে সামনে তুলে ধরা হয়েছে সেই সিনেমাতে। যা নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে কিছু চিকিৎসক সংগঠন। শুরু হওয়া বিতর্ক নিয়ে কী বলছে টলিউড? খোঁজ নিলেন অঞ্জন চক্রবর্তী।
কোনও পেশার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন কুকর্মে জড়িত থাকলে দায় কি সবার উপরেই বর্তায়? নাকি কয়েকজনের ভিত্তিতে কোনও একটি পেশার সবাইকে বিচার করা অনুচিত? পুরোনো এই তরজা নতুন মোড়কে সামনে এসেছে সম্প্রতি। সঙ্গে তর্ক শুরু হয়েছে, সিনেম্যাটিক লিবার্টির কি সীমারেখা থাকা দরকার? নাকি সমাজের আসল চিত্রটা তুলে ধরতে গেলেই সেটা কারও-কারও মতে তা অনধিকার চর্চার সামিল।
এই তরজার প্রেক্ষাপট, সানি দেওল অভিনীত একটি সিনেমা ও তার বিষয়বস্তু নিয়ে চিকিৎসকদের একাংশের প্রতিবাদ। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে রিলিজ় করার কথা ‘সূর্য: অন্ত সে আরম্ভ তক’ সিনেমার। সামনে আসা ছবির ট্রেলারে দেখা গিয়েছে, চিকিৎসকদের একাংশ ও মেডিক্যাল ফ্র্যাটারনিটিকে নেতিবাচক ভাবে দেখানো হয়েছে। সেখানে অভিনেতাকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন নয়, কমিশন লেখেন।’
রোগীদের থেকে অসাধু উপায়ে বাড়তি টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালের বিল নিয়ে অস্বচ্ছতার প্রসঙ্গও সামনে তুলে ধরা হয়েছে। আর তা নিয়েই প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখেছে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের বেঙ্গল স্টেট ব্রাঞ্চ। সেই অভিযোগপত্র তারা পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থেকে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডাকে। সংস্থার তরফে রাজ্য সচিব চিকিৎসক শান্তনু সেনের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘যে ভাবে চিকিৎসকদের ভিলেন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, তা জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

কোভিড-সহ বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসকরা দেশের মানুষদের জন্য যে সার্ভিস দিয়েছিলেন, সেটাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। তাঁদের বক্তব্য, কয়েকজনের জন্য চিকিৎসা জগতের সঙ্গে জড়িত সবাইকে এক ভাবে দেখা উচিত নয়। সেই সঙ্গে সিনেমা রিলিজ়ের প্রাক্কালে প্রয়োজনীয় বদলের আশাও করা হয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠনের তরফে। এই বিষয়ে টলিউড ইন্ডাস্ট্রির সদস্যরা কী বলছেন?
পরিচালক-অভিনেতা কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় একজন চিকিৎসকও। তাঁর মতে, ‘ট্রেলারে যেটুকু অংশ সামনে এসেছে তার ভিত্তিতে কোনও মন্তব্য করা ঠিক নয়। সিনেমা রিলিজ় হলে বিস্তারিত ভাবে বোঝা যাবে। একমাত্র তখনই বলা সম্ভব যে মেডিক্যাল ফ্র্যাটারনিটিকে নেতিবাচক ভঙ্গিতে দেখানো হয়েছে কি না।’ এ দিকে কিছু দিন আগে মুক্তি পেয়েছিল ‘ডাক্তার কাকু’ ছবি।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত সেই সিনেমার পরিচালক পাভেল বলেছেন, ‘মেডিক্যালে সুযোগ পাওয়ার সময় থেকেই তো স্ক্যাম শুরু হয়। প্রশ্নপত্র বিক্রি, পোস্টিং নিয়ে জলঘোলা থেকে অর্গান পাচার, সবই যে হয় সেগুলো তো প্রমাণিত। মৃত্যুর পরেও আইসিইউতে রেখে দেওয়া হয়। এই সব মেডিক্যাল মাফিয়াগিরি তো নতুন নয়। চিকিৎসকদের একাংশের উপর থেকে মানুষের বিশ্বাস যে উঠে গিয়েছে, তা নতুন করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সমাজের বিভিন্ন স্তরেই পচন ধরেছে, মেডিক্যাল ফ্র্যাটারনিটিও তার বাইরে নয়। তবে তার মাঝেই অনেক সৎ ও ভালো চিকিৎসকও রয়েছেন।’
আর চিকিৎসকদের একাংশের চিঠি প্রসঙ্গে পাভেল জোড়েন, ‘বিষয়টা সিনেমায় দেখানো হলেই তো আলোচনার জায়গা তৈরি হবে। সমাজব্যবস্থায় কিছু লাভও হতে পারে। এবার সবেতেই যদি চিঠি-জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়, তা হলে তো সব পেশার মানুষই সেই পথ ধরবেন। সে ক্ষেত্রে সাহস করে সত্যিটা সামনে তুলে ধরার সুযোগটাই তো কমে যাবে। সিনেমাকে তাই সিনেমার জায়গাতে থাকতে দিন, এটুকুই বলতে পারি।’