প্যারা-এশিয়ান গেমসে তিনবারের সোনাজয়ী নীরজের মৃত্যু ঘিরে রহস্য
নয়াদিল্লি: ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলেটিক্স জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। (Neeraj Yadav)তিনবারের প্যারা-এশিয়ান গেমস সোনাজয়ী অ্যাথলিট নীরজ যাদবের মৃত্যুর খবর ঘিরে ক্রীড়ামহলে শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।…
নয়াদিল্লি: ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলেটিক্স জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। (Neeraj Yadav)তিনবারের প্যারা-এশিয়ান গেমস সোনাজয়ী অ্যাথলিট নীরজ যাদবের মৃত্যুর খবর ঘিরে ক্রীড়ামহলে শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৪২ বছর বয়সি এই ভারতীয় অ্যাথলিটের মৃত্যুর খবর ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশ্যে আসে।
প্রাথমিক সংবাদ প্রতিবেদন এবং ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলেটিক্স দলের প্রধান কোচ এস সত্যনারায়ণের বক্তব্য অনুযায়ী, দিল্লির একটি ফ্ল্যাটে বিষ খেয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।( Neeraj Yadav) ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হলেও, মৃত্যুর পেছনে ঠিক কী কারণ কাজ করেছে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এই ঘটনায় ক্রীড়াজগতের এক পরিচিত মুখের জীবনাবসানের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের মানসিক চাপ, ডোপিং সংক্রান্ত বিতর্ক এবং কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরও দেখুনঃ অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ল অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, ঘণ্টায় ১৩০ কিমি বেগে বইছে হাওয়া
নীরজ যাদবের পরিচয় কেবল একজন পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য অর্জন করে তিনি বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শরীরের নিচের অংশে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু সেই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর খেলাধুলার স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি।
হুইলচেয়ারে বসেই জ্যাভলিন থ্রো, ডিসকাস থ্রো এবং শটপাটের মতো ইভেন্টে নিজের দক্ষতা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। দীর্ঘ অনুশীলন, কঠোর পরিশ্রম এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলেটিক্সে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন নীরজ।
২০১৮ সালে জাকার্তায় অনুষ্ঠিত প্যারা-এশিয়ান গেমসে জ্যাভলিন থ্রোয়ে সোনা জিতে নজর কাড়েন তিনি। এরপর ২০২৩ সালে চিনের হাংঝৌয়ে প্যারা-এশিয়ান গেমসে জ্যাভলিন ও ডিসকাস থ্রো দুই বিভাগেই সোনা জয় করেন। তাঁর এই সাফল্য ভারতের প্যারা-স্পোর্টসের অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে। প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য অর্জনের এই যাত্রা তাঁকে অন্য অনেক ক্রীড়াবিদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
তবে নীরজের জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সামনে চলে আসে ডোপিং বিতর্ক। ২০২৩ সালে বেঙ্গালুরুতে প্রতিযোগিতার বাইরে তাঁর যে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, তাতে নিষিদ্ধ অ্যানাবলিক স্টেরয়েড স্ট্যানোজোলল পাওয়ার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। এরপর জাতীয় অ্যান্টি-ডোপিং সংস্থার প্রক্রিয়ায় তাঁকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
নীরজ এই অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য জানান এবং নমুনার পরিচয় যাচাই করতে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করেন। ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনেও তাঁর নমুনার ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন মঞ্জুর হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই নিষেধাজ্ঞার কারণে আসন্ন আইচি-নাগোয়া প্যারা-এশিয়ান গেমসে তাঁর অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলিতে জানানো হয়েছে। (Neeraj Yadav)একজন আন্তর্জাতিক পদকজয়ী অ্যাথলিটের কাছে বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারানো নিঃসন্দেহে কঠিন পরিস্থিতি হতে পারে।
তবে এই ঘটনা নীরজের মৃত্যুর সরাসরি কারণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য এখনও সামনে আসেনি। প্রধান কোচ এস সত্যনারায়ণও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নীরজ কী পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই ডোপিং নিষেধাজ্ঞাকেই তাঁর মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে তুলে ধরা সমীচীন হবে না।
নীরজের মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর দিল্লির গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছিল বলে ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্ত ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক সংবাদে বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণের কথা উঠে এলেও, তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশের আগে ঘটনার প্রতিটি দিক সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করা উচিত নয়। একইভাবে, ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা অনুমানকেও যাচাই ছাড়া সত্য বলে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, ক্রীড়াবিদদের জীবন শুধু পদক, রেকর্ড কিংবা জয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য অর্জনের জন্য দীর্ঘদিনের অনুশীলন, শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ব্যর্থতা, চোট, নিষেধাজ্ঞা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো পরিস্থিতিও তাঁদের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত প্যারা-অ্যাথলিটদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।