রেখার জাদু থামল চিরতরে! প্রয়াত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী
কলকাতা: বাংলা তথা ভারতের শিল্পজগতে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। (Jogen Chowdhury)প্রয়াত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ…
কলকাতা: বাংলা তথা ভারতের শিল্পজগতে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। (Jogen Chowdhury)প্রয়াত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। এ দিন সকাল ১০টা ১৫ মিনিট নাগাদ তাঁর জীবনাবসান হয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী।
সম্প্রতি মূত্রনালির সংক্রমণ এবং শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষরক্ষা হল না। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের অবসান ঘটল। বিশেষ করে রেখার ব্যবহার, মানুষের শরীরের গঠন এবং সমাজজীবনের নানা অনুভূতিকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে যোগেন চৌধুরী নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন।
আরও দেখুনঃ সুন্দরবনের উন্নয়নে ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ! ৩২০২ প্রকল্পের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
তাঁর শিল্পকর্মে শুধু মানুষের অবয়ব নয়, ফুটে উঠত জীবনের টানাপোড়েন, মানসিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক বাস্তবতা এবং সময়ের নানা প্রশ্ন। (Jogen Chowdhury)দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশ-বিদেশের শিল্পপ্রেমীদের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। শিল্পবোদ্ধাদের কাছে তিনি ছিলেন রেখার অসাধারণ কারিগর। তাঁর আঁকার নিজস্ব ভঙ্গি ভারতীয় সমকালীন শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন যোগেন চৌধুরী।
দেশভাগের অস্থির সময়ে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। এই শহরেই গড়ে ওঠে তাঁর শিল্পীসত্তা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পরবর্তী সময়ে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটসে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬০ সালে সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁর শিল্পীজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আরও উন্নত শিল্পশিক্ষার জন্য ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে যান তিনি। সেখানে বিখ্যাত École Nationale Supérieure des Beaux-Arts-এ শিল্পচর্চা করেন।
ইউরোপীয় শিল্পভাবনা এবং বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে ক্রমে তৈরি হয় তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। তাঁর ছবিতে রেখার ঘনত্ব, সূক্ষ্ম ড্রয়িং এবং অবয়বের বিশেষ নির্মাণ দর্শকদের আলাদা করে আকৃষ্ট করত। মানুষের মুখ ও শরীরের গঠনে তিনি এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতেন, যার মধ্যে কখনও প্রকাশ পেত ব্যঙ্গ, কখনও উদ্বেগ, আবার কখনও সমাজের কঠিন বাস্তবতা। রং ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।
তবে তাঁর শিল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল রেখার সাহায্যে চরিত্র ও অনুভূতির প্রকাশ। এই কারণেই তিনি শিল্পমহলে ‘মাস্টার অব লাইনস’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।(Jogen Chowdhury) শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন যোগেন চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটর বা শিল্পসংগ্রহের দায়িত্বে কাজ করার পর ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে যোগ দেন। সেখানে চিত্রকলার অধ্যাপক হিসেবে বহু বছর শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর শিল্পভাবনা ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদেরও প্রভাবিত করেছে। শিল্পের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়নে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প ও জনজীবনের মধ্যে তাঁর এই সংযোগ ছিল কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক।
শিল্পক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হন তিনি। তাঁর প্রয়াণে শুধু একজন খ্যাতনামা চিত্রশিল্পীকে হারাল না দেশ, হারাল এমন এক স্রষ্টাকে, যিনি নিজের শিল্পভাষায় মানুষের অনুভূতি ও সমাজের নানা দিককে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর আঁকা ছবি, রেখার স্বতন্ত্র প্রয়োগ এবং শিল্পশিক্ষায় অবদান আগামী দিনেও ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।