ইতালিতে বিক্ষোভের আগে ৩৩০০ নিরাপত্তাকর্মী ও ড্রোন মোতায়েন
রোম: জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক ঘিরে ইতালির (Italy Protests) একাধিক বড় শহরে নিরাপত্তা জোরদার করল প্রশাসন। শনিবার, ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ সামাল দিতে পুলিশ, সেনা ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী মিলিয়ে হাজার হাজার সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হবে ড্রোনও। সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের বিক্ষোভে হিংসাত্মক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ।
রাজধানী রোমে প্রায় ১,৫০০ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে। অন্যদিকে, মিলানে পুলিশ, পুরসভার নিরাপত্তাকর্মী এবং সেনা মিলিয়ে প্রায় ১,৮০০ জনকে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। মিলান ছাড়াও বোলোনিয়া, জেনোয়া, তুরিন, রোম ও ফ্লোরেন্সে বিক্ষোভ কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে। ইউরোনিউজের দাবি, দেশজুড়ে মিছিল, অবস্থান বিক্ষোভ, সমাবেশ ও ধর্মঘট মিলিয়ে ৩০টিরও বেশি কর্মসূচি নির্ধারিত হয়েছে।
রোমে ড্রোনে নজরদারি, অনলাইন কার্যকলাপেও নজর পুলিশের
রোমে অনুমোদিত বিক্ষোভের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষিত আকস্মিক জমায়েত সামাল দিতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করেছে পুলিশ। ইতালির স্টেট পুলিশের প্রথম ফ্লাইট বিভাগের ড্রোন এবং কারাবিনিয়েরি বাহিনীর বিমান ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হবে। জনবহুল চত্বরের পাশাপাশি রেলস্টেশনগুলিতেও নিরাপত্তা পরীক্ষা জোরদার করা হচ্ছে।
বিক্ষোভের আগে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন নির্দেশিকা ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেলিগ্রাম, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত পোস্ট এবং অনলাইন কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে রোমের সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র। এ কাজে পুলিশের বিশেষ অপারেশনাল বিভাগ ডিজিওসের সঙ্গে সমন্বয় রাখা হচ্ছে।
ALSO READ | মার্কিন নাগরিকদের খুনের ছক কষছে ইরান, চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি! চাঞ্চল্যকর তথ্যে শোরগোল
মিলানে ১,৮০০ নিরাপত্তাকর্মী, একাধিক এলাকায় বিধিনিষেধ
মিলানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রায় ১,০০০ পুলিশ ও কারাবিনিয়েরি সদস্য, ৩০০ জন পুরসভার নিরাপত্তাকর্মী এবং ৫০০ সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিক্ষোভের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ড্রোনও ব্যবহার করা হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুমোদিত বিক্ষোভের স্থান ডুওমো চত্বর থেকে দূরে নির্ধারণ করা হয়েছে। গারিবাল্ডি ও পোর্তা ভেনেজিয়া এলাকায় বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
মিলান ও ইতালির অন্যান্য বড় শহরে সপ্তাহান্তে, বিশেষত শনিবার, বিক্ষোভের আশঙ্কা বেশি বলে সতর্ক করেছে ইতালিতে অবস্থিত মার্কিন মিশন। সাধারণ মানুষকে ডুওমো চত্বর এবং ভিয়া দান্তে, ভিয়া তোরিনো, করসো ভিত্তোরিও এমানুয়েলে দ্বিতীয়, করসো বুয়েনস আইরেস, করসো জেনোভা ও করসো ভারচেল্লির মতো ব্যস্ত বাণিজ্যিক রাস্তা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন মিশনের তালিকা অনুযায়ী, মিলানে তিনটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। শুক্রবার আর্কো দেলা পাসে এবং সান ভিত্তোরে কারাগারের কাছে কর্মসূচি রয়েছে। শনিবার কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত হয়েছে পিয়াজা লেওনার্দো দা ভিঞ্চি। বিক্ষোভ ও বড় জমায়েত এড়িয়ে চলা, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর নজরে রাখা, আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং বিক্ষোভের প্রভাব পড়া এলাকা থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে মার্কিন মিশন।
ALSO READ |
ইতালি-সহ তিন দেশে ভারতীয়দের সতর্কবার্তা
ইতালির পাশাপাশি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামেও বিক্ষোভের পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ভারত সরকার। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লিতে দ্বি-সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে জানান, তিনটি দেশেই ভারতীয় দূতাবাস পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
জয়সওয়াল বলেন, বিক্ষোভ চলা এলাকায় যাতায়াতের সময় ভারতীয় নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেখানে বিক্ষোভ হচ্ছে, সেই এলাকা এড়িয়ে চলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসনের জারি করা নির্দেশিকাও মেনে চলতে হবে।
তিনি আরও জানান, ফ্রান্স ও ইতালিতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস ইতিমধ্যেই নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে। বিদেশে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র।
হিংসার নিন্দায় প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি
এর আগে ১৮ অক্টোবরের বিক্ষোভে হিংসার ঘটনার নিন্দা করেছিলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। সমাজমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো এবং বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে।
মেলোনি নিরাপত্তাকর্মীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন, নাগরিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের হিংসার মুখে পড়তে হয়েছে। শহরের মানুষ যাতে ভয় ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের পরেও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীদের হিংসার ঘটনাগুলির স্পষ্ট নিন্দা করার আহ্বান জানান তিনি।
মেলোনির বক্তব্য অনুযায়ী, মিলান, তুরিন ও বোলোনিয়ায় বিক্ষোভ চলাকালীন নিরাপত্তাকর্মীদের নিশানা করা হয়েছিল। কাচ ভাঙার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন সরঞ্জাম ও পেভিং ব্লক বহনকারী কয়েকজনকে আটকানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেন। বোলোনিয়ায় অশান্তির জেরে শহরের কেন্দ্রীয় রেল যোগাযোগকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
মেলোনি স্পষ্ট করেন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু শহরে আগুন লাগানো, নিরাপত্তাকর্মীদের উপর হামলা চালানো বা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করার অধিকার কারও নেই। হিংসার বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে কর্মসূচির মধ্যে ইতালির প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার বজায় রেখে সম্ভাব্য হিংসা ও জনজীবনে বিঘ্ন এড়ানো।