রাহুলকে নিশানা মোদীর, কংগ্রেসকে বললেন ‘পরজীবী’
নয়াদিল্লি: কংগ্রেসকে ‘পরজীবী’ বলে আক্রমণ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জেরে সরকারের সমালোচনা করতে চাওয়া বিভিন্ন আন্দোলন এবং বিরোধী দলের তরুণ নেতাদের কণ্ঠস্বরও চাপা পড়ছে। রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে মোদীর আরও দাবি, কংগ্রেসে এক পরিবারের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বাড়ছে এবং দলের প্রবীণ নেতারাও ব্যক্তিগত আলোচনায় সেই হতাশার কথা স্বীকার করেন।
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে NDTV World Summit 2026-এ মূল ভাষণ দিতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী যখন ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন NDA সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, তখনই মোদীর এই আক্রমণ রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
‘পরজীবী কংগ্রেস অন্যদের এগোতে দিতে চায় না’
প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, কংগ্রেস বারবার ব্যর্থ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে সামনে আসছে এবং তার ফলে বিরোধী শিবিরের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হচ্ছে। তিনি কংগ্রেসের জন্য ‘পরজীবী’ শব্দ ব্যবহার করেন। পাশাপাশি ‘দিমাগি নকশাল’ বা ‘মানসিক নকশাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে দলের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেন।
মোদীর বক্তব্য, গণতন্ত্রে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা এবং ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কংগ্রেসের তৈরি করা রাজনৈতিক শোরগোলে সেই সমালোচকদের বক্তব্যও হারিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “এমন অনেক আন্দোলন রয়েছে, যারা স্বাভাবিকভাবেই সরকারের দুর্বলতা তুলে ধরতে চায় এবং ব্যবস্থার সংস্কার করতে আগ্রহী। গণতন্ত্রে এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু যারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারের বিরোধিতা করতে চান, কংগ্রেসের শোরগোলের মধ্যে তাঁদের কণ্ঠস্বরও হারিয়ে যায়।”
প্রধানমন্ত্রীর দাবি, কংগ্রেস অন্য রাজনৈতিক শক্তি ও আন্দোলনগুলিকে নিজেদের প্রভাবের মধ্যে রাখতে চায় এবং কাউকে স্বাধীনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে চায় না।
ALSO READ | ‘অনুপ্রবেশকারীদের ভোট রক্ষা করতেই…’, সিইসি বিরোধিতায় রাহুলকে তীব্র আক্রমণ অমিত শাহের
‘সংসদে তরুণ সাংসদদের কথা বলতে দেয় না কংগ্রেস’
সংসদের কার্যক্রম নিয়েও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন মোদী। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী শিবিরে অনেক প্রতিভাবান তরুণ সাংসদ রয়েছেন, যাঁরা সরকারের সমালোচনা করতে এবং নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে চান। কিন্তু কংগ্রেস সংসদের কাজকর্ম ব্যাহত করে তাঁদের কথা বলার সুযোগ সীমিত করছে বলে অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর।
মোদীর দাবি, কংগ্রেসের লক্ষ্য সংসদে একজন নেতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারের আলো ধরে রাখা। সেই কারণেই অন্য বিরোধী নেতাদের বক্তব্য সামনে আসুক, তা দলটি চায় না।
তবে এগুলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ। সংসদের কার্যক্রমে বিরোধী দলগুলির ভূমিকা নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিবেশনের কার্যবিবরণী ও অন্যান্য তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
‘গান্ধী পরিবারই কংগ্রেসের বোঝা’, দাবি প্রধানমন্ত্রীর
কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নিয়েও আক্রমণ শানিয়েছেন মোদী। তাঁর বক্তব্য, রাহুল গান্ধীকে বারবার রাজনৈতিকভাবে সামনে রাখার প্রবণতা দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে। গান্ধী পরিবারকে ব্যর্থতার দায় থেকে আড়াল করতে কংগ্রেস দেশের সাফল্য ও অগ্রগতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই পরিবারই কংগ্রেসের কাছে বোঝা হয়ে উঠেছে। দলের প্রবীণ নেতারাও বিষয়টি বোঝেন। তাঁরা যখন আমাদের সঙ্গে দেখা করেন, তখন এ কথাও বলেন। কিন্তু অপমান সহ্য করেও তাঁরা নীরব থাকেন।”
তাঁর আরও অভিযোগ, দেশের সাফল্যকে স্বীকার করার পরিবর্তে কংগ্রেস রাজনৈতিক বিরোধিতার স্বার্থে ভারতের অগ্রগতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ALSO READ | ইনস্টাগ্রামে ইন্দিরা-বধূ! প্রকাশ্যে আত্মজীবনী ‘বিলিঙ্গ: আ জার্নি অফ লাভ’-এর প্রথম ঝলক
মোদীর আক্রমণের জবাব পবন খেড়ার
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন কংগ্রেসের মুখপাত্র পবন খেড়া। সমাজমাধ্যম X-এ মোদীর ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, “ভাই, আমাদের নিয়ে চিন্তা করবেন না। নিজের অক্ষমতার বোঝা গুছিয়ে বিদায় হোন। দেশের বোঝা হয়ে থাকবেন না।”
কংগ্রেসের তরফে এই প্রতিক্রিয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও বাড়িয়েছে।
INDIA জোটে সমীকরণ বদল, ভোটে কারচুপি নিয়ে আন্দোলন
বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়েও আলোচনা করেছেন প্রতিবেদকরা। কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন INDIA জোটে সমাজবাদী পার্টি এবং বাম দলগুলি রয়েছে। অন্যদিকে, AAP-এর মতো দলও বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। যুব আন্দোলন Cockroach Janta Party (CJP)-ও শিক্ষামন্ত্রী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করে আলোচনায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোটে কারচুপির অভিযোগে রাহুল গান্ধীর আন্দোলনকে ঘিরে কংগ্রেস ও CJP-র মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সমন্বয় দেখা গিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের পর INDIA জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক DMK-র সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, DMK নেতা এম কে স্ট্যালিনের দল রাহুল গান্ধীর ‘ভোট চুরি’ আন্দোলনে অংশ নেয়নি। তবে একই ইস্যুতে CJP-র তরফে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে সমর্থন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটেই কংগ্রেস ও বিরোধী শিবিরের ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
‘ভারতের সুনাম ধুলোয় মেশানোর চেষ্টা করছে কংগ্রেস’
ভাষণের অন্য অংশে মোদী অভিযোগ করেন, কংগ্রেস ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে ভারতীয়দের মধ্যে ‘আমরা পারব’ মনোভাব থাকা জরুরি।
বিশ্বের বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়েও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, রাষ্ট্রসংঘ-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বর্তমান বিশ্বের জটিল সমস্যাগুলির মোকাবিলায় তাদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, বাণিজ্য ক্রমশ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে এবং সমুদ্রপথ ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
চাণক্যের ‘মৎস্যন্যায়’ তত্ত্বের উল্লেখ
বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যাখ্যা করতে চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের ‘মৎস্যন্যায়’ ধারণার উল্লেখ করেন মোদী। এই ধারণায় বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়, অর্থাৎ শক্তিশালী পক্ষ দুর্বল পক্ষের উপর আধিপত্য বিস্তার করে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, বিশ্বে এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা শক্তিশালীর হাতে দুর্বলের অধিকার নষ্ট হওয়া আটকাতে পারে।
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি কোভিড মহামারির সময় ১০০টিরও বেশি দেশে ভারতের টিকা ও ওষুধ সরবরাহের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ভারতের নেতৃত্বে G20 এবং BRICS সম্মেলনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত ঘোষণাগুলিকেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
NDTV World Summit 2026-এ মোদীর ভাষণের বড় অংশ জুড়েই ছিল কংগ্রেস, রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী রাজনীতিকে আক্রমণ। একদিকে তিনি বিরোধী দলগুলির অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, অন্যদিকে ভারতের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ভূমিকার পক্ষে সওয়াল করেছেন। কংগ্রেসের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট, এই বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।