পুলওয়ামায় BMS-এর প্রথম প্রকাশ্য অফিস! কাশ্মীরে RSS-এর নতুন পদক্ষেপ
শ্রীনগর: জম্মু-কাশ্মীরের উপত্যকায় সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর পথে আরও এক ধাপ এগোল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-ঘনিষ্ঠ ভারতীয় মজদুর সংঘ (BMS)। পুলওয়ামা জেলার বারসু গ্রামে সংগঠনটি একটি প্রকাশ্য অফিস খুলেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের দাবি, কাশ্মীর উপত্যকায় RSS-এর কোনও সহযোগী সংগঠনের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকাশ্য কার্যালয়। মুসলিম-প্রধান এই অঞ্চলে সংগঠনটির দৃশ্যমান উপস্থিতি ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
BMS-এর কাশ্মীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সমীর কুচয়ের দাবি, আনুষ্ঠানিক অফিস খোলার আগেই উপত্যকায় সংগঠনটির কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাশ্মীরের ২০টি শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক BMS-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। সংগঠনের প্রভাবও ক্রমশ বাড়ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
ALSO READ | কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১১১ ছাড়াল, দেশে জরুরি অবস্থা জারি
৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর পরিস্থিতি বদলেছে, দাবি BMS নেতার
২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর কাশ্মীরের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন সমীর কুচয়ে। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছরে উপত্যকায় সংগঠনের কাজ করা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে এবং তাঁরা এখন প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যকলাপ চালাতে পারছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চের (MRM) মতো RSS-ঘনিষ্ঠ সংগঠনও আগে থেকে উপত্যকায় কাজ করছিল। তবে প্রকাশ্যে অফিস প্রতিষ্ঠা করার ঘটনাকে কাশ্মীরে সংঘ পরিবারের দৃশ্যমান সাংগঠনিক উপস্থিতি বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও এই পরিবর্তনের মাত্রা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সংগঠনটির প্রকৃত প্রভাব কতটা বেড়েছে, তা নির্ধারণের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও বিস্তৃত জনমত সমীক্ষা প্রয়োজন।
ALSO READ | অষ্টম বেতন কমিশন: ন্যূনতম কত টাকা বেতনের দাবি আইআরটিএসএ-র?
‘RSS মুসলিম-বিরোধী নয়’, বলছেন সমীর কুচয়ে
কাশ্মীরের বাসিন্দাদের মধ্যে RSS সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বদলানোর চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন সমীর কুচয়ে। তাঁর বক্তব্য, RSS-কে মুসলিম-বিরোধী সংগঠন হিসেবে দেখার ধারণা সঠিক নয়।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি একজন মুসলিম। আমি বলতে পারি, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ার কারণে আমাকে কখনও বৈষম্যের মুখে পড়তে হয়নি। আমাকে সব সময় বলা হয়েছে, কীভাবে মানবতার সেবা করা যায় এবং দেশ গঠনে অবদান রাখা যায়, তা বুঝতে হলে RSS-এর সঙ্গে কাজ করতে হবে।”
সমীরের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং RSS-এর সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের বক্তব্য তাঁকে সংগঠনটির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তবে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নকে কাশ্মীরের সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর মতামত হিসেবে দেখা যায় না।
‘শিশুদের হাতে পাথর বা বন্দুক নয়, কলম থাকা উচিত’
কাশ্মীরে আদর্শগত পরিবর্তন ঘটছে বলেও দাবি করেছেন BMS-এর এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, ২০১৯ সালের আগে উপত্যকায় সংগঠন চালানো কঠিন ছিল। এখন আরও বেশি মানুষ তাঁদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
সমীর কুচয়ের কথায়, “এখন মানুষ বুঝতে পেরেছেন, আমাদের সন্তানদের হাতে পাথর ও বন্দুক নয়, কলম থাকা উচিত।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি হিংসার পরিবর্তে শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছেন। তবে কাশ্মীরে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন কতটা ঘটেছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি সংগঠনের নেতার বক্তব্য সেই পরিবর্তনের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না।
শ্রীনগরে সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে RSS-এর সম্মেলন
কাশ্মীরে সংগঠনটির কার্যকলাপ বৃদ্ধির আবহে বুধবার শ্রীনগরে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে RSS। জম্মু-কাশ্মীর ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং আল রহিম ট্রাস্টের সহযোগিতায় ‘অসলুক আলাভ’ বা ‘মহৎ আহ্বান’ শিরোনামে এই অনুষ্ঠান হয়।
বিজেপির বক্তব্য অনুযায়ী, সম্মেলনে ব্যবসায়ী, যুবনেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল মতবিনিময়, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা।
অনুষ্ঠানে RSS নেতা রামলাল কাশ্মীরের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, উপত্যকায় সনাতনী ও সুফি সাধকেরা ঐতিহাসিকভাবে পাশাপাশি বসবাস করেছেন এবং সহাবস্থানের ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন।
তিনি বলেন, বাইরের মানুষের ধারণা বা প্রভাবের দ্বারা পরিচালিত না হয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা বাড়ানো উচিত। হিংসার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘কাশ্মীরে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য হিংসা পথ নয়’
সম্মেলনে রামলাল বলেন, RSS-এর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে সহজে আলোচনা করতে পেরেছেন। তাঁর মতে, কাশ্মীর সম্পর্কে বাইরে থেকে ধারণা তৈরি করা সহজ, কিন্তু বাস্তবে মানুষের সঙ্গে কথা না বলে কোনও সংগঠন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, “সন্ত্রাস ও হিংসার একটি কঠিন সময় ছিল। কিন্তু এখন মানুষ বুঝেছেন, সন্ত্রাস ও হিংসা শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে পারে না।”
কাশ্মীরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি তাঁদের বাইরের প্রভাবের দ্বারা পরিচালিত না হওয়ার আহ্বান জানান।
কাশ্মীরে সংঘ পরিবারের উপস্থিতি ঘিরে নতুন আলোচনা
পুলওয়ামায় BMS-এর প্রকাশ্য অফিস খোলা এবং শ্রীনগরে RSS-ঘনিষ্ঠ সম্মেলন, দুটিই উপত্যকায় সংঘ পরিবারের কার্যকলাপের দৃশ্যমানতা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
তবে BMS-এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা, সংগঠনের প্রসারের মাত্রা এবং কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে কথিত আদর্শগত পরিবর্তনের দাবিগুলি মূলত সংগঠনের প্রতিনিধিদের বক্তব্যের উপর নির্ভরশীল। স্বাধীন তথ্যের ভিত্তিতে এগুলি যাচাই করা জরুরি।
কাশ্মীরের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বহুমাত্রিক। তাই একটি অফিস প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ঘটনা হিসেবে দেখা গেলেও, এর ভিত্তিতে সমগ্র উপত্যকার জনমত বদলে গিয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।