ডায়াবেটিসে আগে প্রোটিন না ফাইবার? খাবার খাওয়ার সঠিক ক্রম
Diabetes Control: ডায়াবেটিস থাকলে শুধু কী খাচ্ছেন বা কতটা খাচ্ছেন, সেটাই নয়, খাবার কোন ক্রমে খাচ্ছেন, সেটিও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভাত, রুটি বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার খাওয়ার আগে ফাইবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘মিল সিকোয়েন্সিং’ বা খাবার খাওয়ার ক্রম নির্ধারণ। তবে এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সহায়ক কৌশল, ওষুধ বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।
ডায়াবেটিস থাকলে কোন খাবার আগে খাবেন?
সাধারণভাবে খাবার খাওয়ার একটি ব্যবহারিক ক্রম হতে পারে প্রথমে ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি, তার পরে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং সবশেষে কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার। এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য হল হজমের গতি ও খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে প্রত্যেকের শরীরের প্রতিক্রিয়া এক রকম নয়। খাবারের পরিমাণ, কার্বোহাইড্রেটের ধরন, ওষুধ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের অবস্থাও রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব ফেলে।
ALSO READ | দিঘা-বকখালি থেকে কালিম্পঙ! গত এক বছরে বাংলার পর্যটনে বেসরকারি বিনিয়োগ ৫,৭১০ কোটি
১. প্রথমে খান ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি
খাবার শুরু করতে পারেন ফাইবার বা খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ, কম শ্বেতসারযুক্ত সবজি দিয়ে। যেমন শসা, ব্রকোলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শাক এবং অন্যান্য সবুজ সবজি। খাদ্য-আঁশ হজমের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং অন্ত্রে গ্লুকোজ শোষণের গতি কিছুটা ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কমতে পারে। পাশাপাশি ফাইবার পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করে।
তবে সবজির সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি সস বা চিনি মেশানো ড্রেসিং এড়ানো ভালো। সবজি খাওয়ার পাশাপাশি দিনের মোট খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফাইবার রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২. এর পরে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট
সবজির পরে খেতে পারেন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। ডাল, ছোলা, মাছ, ডিম, চিনি ছাড়া দই, পনির বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য প্রোটিনের উৎস বেছে নেওয়া যায়। বাদাম, বীজ এবং উপযুক্ত পরিমাণে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর ফ্যাটও সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
প্রোটিন ও ফ্যাট হজমের গতি এবং খাবারের পর শরীরের গ্লুকোজ প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রোটিন পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করে। অন্ত্রে খাবার পৌঁছনোর পর জিএলপি-১-এর মতো কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়, যা ক্ষুধা, হজম এবং ইনসুলিন নিঃসরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে শুধু প্রোটিন বা ফ্যাট খেলেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন নয়। খাবারের সামগ্রিক গঠন এবং পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
ALSO READ | খাদ্য রসিক থেকে চকোলেট প্রেম! ৪৭ বছরেও ইমরান হাশমির ফিটনেসের রহস্য ফাঁস
৩. সবশেষে খান ভাত, রুটি ও অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট
খাবারের শেষ পর্যায়ে রাখা যেতে পারে ভাত, রুটি, ওটস, আলু বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার। কার্বোহাইড্রেট হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়, তাই খাবারের পর রক্তে শর্করা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শাকসবজি ও প্রোটিন খাওয়ার পরে কার্বোহাইড্রেট খেলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গ্লুকোজের মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়তে পারে।
তবে ডায়াবেটিস থাকলেই ভাত বা রুটি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। কতটা খাবেন এবং কোন ধরনের কার্বোহাইড্রেট বেছে নেবেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সম্পূর্ণ শস্যের খাবার, ডাল এবং ফাইবারসমৃদ্ধ কার্বোহাইড্রেট সাধারণত পরিশোধিত শস্য বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবারের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর। সাদা পাউরুটি, মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয় এবং অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
খাবারের ক্রম ঠিক রাখতে কী করবেন?
একবারে সব খাবার মিশিয়ে না খেয়ে শুরুতে সবজি বা ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। এরপর প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং তার সঙ্গে বা পরে ভাত-রুটির মতো কার্বোহাইড্রেট খেতে পারেন। প্রতিটি ধাপের মধ্যে অবশ্যই পাঁচ থেকে দশ মিনিট বিরতি দিতে হবে, এমন কোনও সর্বজনীন চিকিৎসা-নিয়ম নেই। তাই শুধু নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান বজায় রাখার চেয়ে খাবারের সামগ্রিক গঠন, পরিমাণ এবং নিয়মিত অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি বাস্তবসম্মত।
খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে জল বেছে নেওয়া ভালো। ফলের রসের পরিবর্তে পরিমাণমতো গোটা ফল খেলে সাধারণত বেশি ফাইবার পাওয়া যায়। খাবার শেষ করার পরে নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী অল্প সময় হাঁটাও রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের পর প্রায় ১০ মিনিট হাঁটা একটি ব্যবহারিক সূচনা হতে পারে। তবে যাঁদের চলাফেরায় সমস্যা রয়েছে বা যাঁদের চিকিৎসক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ দিয়েছেন, তাঁদের সেই পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ওষুধ বন্ধ নয়
খাবার খাওয়ার ক্রম পরিবর্তন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে শর্করার ওঠানামা কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা হয় এবং এই পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে একই ফল দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমাতে পারে এমন ওষুধ গ্রহণ করলে খাবারের সময় বা পরিমাণে বড় পরিবর্তন করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। খাবারের ক্রম বদলানোর জন্য নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের মাত্রা কমানো বা বন্ধ করা বিপজ্জনক হতে পারে।
সারকথা: ডায়াবেটিস থাকলে প্রথমে ফাইবারসমৃদ্ধ সবজি, তার পরে প্রোটিন এবং শেষে কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার অভ্যাস চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে খাবারের ক্রমের পাশাপাশি মোট খাবারের পরিমাণ, কার্বোহাইড্রেটের গুণমান এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনাই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি।