জোয়ার-ভাটাই ঠিক করে গঙ্গার শুশুকের আনাগোনা? কী বলছে গবেষণা?

নদীর জল কখনও বাড়ে, কখনও কমে। জোয়ার-ভাটার এই নিত্যখেলা আর সময়ের ছন্দের উপর রেখেই দিন কাটায় পশ্চিমবঙ্গের রূপনারায়ণ নদীর গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুকেরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নদীর জলস্তর, জোয়ার-ভাটা, দিনের বিভিন্ন সময় এবং চাঁদের ফালির উপর অদ্ভুত ভাবে নির্ভর করে এই জলচর প্রাণীদের আনাগোনা।

ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII)-এর গবেষক গার্গী রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে এই গবেষণাটি করা হয়। রূপনারায়ণ নদী বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূরে হুগলি নদীর একটি ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উপনদী। কোলাঘাট থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ও যান্ত্রিক নৌকার ব্যস্ততা সত্ত্বেও এই নদীর জলে ডলফিনের বেশ ভালো একটি বসবাস রয়েছে।

ডলফিনের গতিবিধি মাপতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে নদীর জলের নীচে ‘F-POD’ নামের একটি বিশেষ শব্দ রেকর্ড করার যন্ত্র বসানো হয়েছিল। প্রবল জোয়ার-ভাটার স্রোতের বিপরীতে যন্ত্রটিকে টিকিয়ে রাখা ছিল গবেষকদের জন্য এক কঠিন কাজ। এই যন্ত্রের সাহায্যে মূলত ডলফিনের বিশেষ আওয়াজ বা ‘ক্লিক ট্রেন’ রেকর্ড করা হয়।

টানা এক মাসের সেই রেকর্ড বিশ্লেষণ করে গবেষকরা অবাক হয়েছেন। দেখা গিয়েছে, ডলফিনেরা সারাদিনের মধ্যে নির্দিষ্ট দু’টি সময়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে — একটি ভোর ৪টে থেকে ৬টার মধ্যে, আর অন্যটি সন্ধে ৬টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে। ঠিক এর উল্টো চিত্র দেখা যায় দুপুর ১০টা থেকে বিকেল ৩টের মধ্যে, যখন তাদের উপস্থিতি সবচেয়ে কম থাকে।

ডলফিনের উপস্থিতির সঙ্গে নদীর জোয়ার-ভাটার জলের গভীরতার এক দারুণ মিল পাওয়া গিয়েছে। নদীর জলস্তর যখন দেড় থেকে দুই মিটার থাকে, তখন ডলফিনের সাড়াশব্দ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। কিন্তু জল যদি চার মিটারের বেশি বেড়ে যায়, তবে রেকর্ডারে ডলফিনের উপস্থিতি একধাক্কায় অনেক কমে যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, জল কম বা মাঝারি থাকলে ছোট মাছ ও শিকার এক জায়গায় জমা হয়। ফলে ডলফিনদের খাবার খুঁজতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু জল বেড়ে গেলে তারা অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে যন্ত্রে তাদের আর ধরা যায় না।

শুধু জোয়ার-ভাটা নয়, চাঁদের দশার ,সঙ্গেও ডলফিনের যোগাযোগের ইঙ্গিত মিলেছে। দেখা গিয়েছে, অমাবস্যার রাতে ডলফিনের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকে, আর শুক্লপক্ষে চাঁদ যত বড় হতে থাকে, তাদের সাড়াশব্দও তত বাড়তে থাকে। তবে বিষয়টি নিয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

এই গবেষণার ফলাফল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দারুণ এক বার্তা দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ডলফিনেরা ঠিক যে সময়ে নদীতে সবচেয়ে বেশি ঘোরাফেরা করে, ঠিক সেই সময়েই নদীর বুকে বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রলারের চলাচলও বেড়ে যায়। ফলে জাহাজের বিকট শব্দের কবলে পড়ার ঝুঁকিও তাদের জন্য বহুগুণ বেড়ে যায়।

ভবিষ্যতে গাঙ্গেয় ডলফিনের সঠিক সংখ্যা বা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে কেবল জায়গা নয়, বরং জোয়ার-ভাটার এই সময়টাকেও হিসেবে ধরতে হবে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত রূপ ও সময়ের ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডলফিনেরা কী ভাবে বেঁচে থাকে, তা আমাদের নদীমাতৃক ecosystems-কে বুঝতে আরও অনেক নতুন পথ দেখাচ্ছে।