ভুট্টা ও চালের ইথানলের দাম বাড়ানোর দাবি, কেন্দ্রকে চিঠি ডিস্টিলারি শিল্পের
নয়াদিল্লি: ভুট্টা ও চাল থেকে তৈরি ইথানলের (Ethanol) ক্রয়মূল্য বাড়ানো এবং আখ থেকে ইথানল উৎপাদনে আরও নমনীয়তা দেওয়ার দাবি জানাল সর্বভারতীয় ডিস্টিলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা এআইডিএ। ২০২৬-২৭ ইথানল সরবরাহ বছরের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলির টেন্ডার প্রকাশের পর এই দাবি সামনে এনেছে শিল্প সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, ইথানল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এমন নীতি প্রয়োজন, যাতে ভুট্টা, চাল এবং আখ, কোনও একটি কাঁচামালকে অতিরিক্ত সুবিধা না দিয়ে সব ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার বাণিজ্যিক কার্যকারিতা বজায় রাখা যায়।
১৭ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে এআইডিএ জানিয়েছে, কাঁচামালের দাম, প্রক্রিয়াকরণ, জ্বালানি, রাসায়নিক এবং পরিবহণের খরচ বাড়ায় ইথানল উৎপাদকদের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই কাঁচামালভিত্তিক খরচের কাঠামো বিবেচনা করে ক্রয়মূল্য ও আর্থিক প্রণোদনা নির্ধারণ করা জরুরি।
ভুট্টার ইথানলে প্রণোদনা কমানো নিয়ে আপত্তি
এআইডিএ-র অন্যতম প্রধান দাবি হল, ভুট্টা থেকে তৈরি ইথানলের ক্ষেত্রে প্রণোদনা কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি লিটারে প্রণোদনার পরিমাণ ৫.৭৯ টাকা থেকে কমিয়ে ২.৭৯ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে কার্যকর ক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটারে ৬৮.৮৬ টাকা।
সংগঠনটির মতে, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার খরচের সঙ্গে এই মূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রণোদনা কমলে শস্যভিত্তিক ডিস্টিলারিগুলির লাভের পরিমাণে চাপ পড়তে পারে। এতে নতুন উৎপাদন ক্ষমতা তৈরির বিনিয়োগ এবং কৃষকদের কাছ থেকে ভুট্টা কেনার ধারাবাহিকতাও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এআইডিএ-র দাবি, বিভিন্ন কাঁচামালের উৎপাদন খরচ অনুযায়ী প্রণোদনা নির্ধারণ করা উচিত। একটি কাঁচামালকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়া হলে অন্য উৎপাদন ব্যবস্থার আর্থিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এফসিআইয়ের উদ্বৃত্ত চালের ইথানলেও দাম বাড়ানোর দাবি
ভুট্টার পাশাপাশি ভারতীয় খাদ্য নিগম বা এফসিআইয়ের সরবরাহ করা উদ্বৃত্ত চাল থেকে তৈরি ইথানলের ক্রয়মূল্য বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। বর্তমানে এই ইথানলের ক্রয়মূল্য প্রতি লিটারে ৬০.৩২ টাকা বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এআইডিএ-র বক্তব্য, কাঁচামাল, জ্বালানি, রাসায়নিক, প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিবহণের খরচ বাড়ায় এই দামে উৎপাদকদের লাভের পরিমাণ সীমিত হয়ে পড়ছে। তাই ক্রয়মূল্য বাড়ানো হলে চালভিত্তিক ইথানল উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে আরও কার্যকর হতে পারে।
এর পাশাপাশি উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যকে জ্বালানি উৎপাদনে কাজে লাগানোর সুযোগও বাড়বে বলে মনে করছে সংগঠনটি। তবে খাদ্যশস্যের ব্যবহার, সরবরাহ এবং অন্যান্য সরকারি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই ব্যবস্থা চালানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা।
আখের রস, সিরাপ ও মোলাসেস ব্যবহারে নমনীয়তা চায় শিল্প
আখ থেকে তৈরি ইথানলের ক্ষেত্রেও নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে এআইডিএ। সংগঠনটি আখের রস, চিনির সিরাপ এবং বি-হেভি মোলাসেস থেকে ইথানল উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত বাণিজ্যিক নমনীয়তা চায়।
তাদের মতে, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, বাজারের পরিস্থিতি এবং উৎপাদন খরচ অনুযায়ী চিনি কল ও ডিস্টিলারিগুলিকে উৎপাদনের ধরন বদলানোর সুযোগ দেওয়া হলে শিল্পের পক্ষে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে। তবে এই নমনীয়তা সরকারি নীতির সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চিনির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর করার কথা বলেছে সংগঠনটি।
এআইডিএ-র মতে, আখভিত্তিক ও শস্যভিত্তিক ইথানল উৎপাদনকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। এতে একটি কাঁচামালের সরবরাহ কমে গেলেও অন্য উৎস থেকে উৎপাদন বজায় রাখার সুযোগ থাকবে।
এল নিনোর আশঙ্কায় কাঁচামালের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
ইথানল উৎপাদনের জন্য কৃষিজ কাঁচামালের উপর নির্ভরতা থাকায় আবহাওয়ার পরিবর্তনও শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এআইডিএ-র বক্তব্য, বর্ষার ধরনে পরিবর্তন এবং এল নিনো-সম্পর্কিত কৃষি অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে ভুট্টা, চাল ও আখের উৎপাদন এবং সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে উৎপাদন কমে গেলে বা কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে ইথানল উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে। তাই একাধিক কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে সরবরাহের ওঠানামা সামাল দেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
এআইডিএ-র সভাপতি বিজেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ ইথানল সরবরাহ বছরের টেন্ডারে কৃষির পরিস্থিতি, কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং ইথানলের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রাখার জন্য সরকারের প্রচেষ্টাকে সংগঠনটি স্বীকার করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ বজায় রাখতে বিভিন্ন কাঁচামালের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রণোদনা ও ক্রয়মূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংগঠনের সহ-সভাপতি কুশল মিত্তলও বলেছেন, ইথানল কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের ব্যবহার এবং পূর্বানুমানযোগ্য নীতির উপর। তাঁর মতে, প্রণোদনা ও ক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে কোনও একটি কাঁচামাল যেন অন্যগুলির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করা দরকার।
এআইডিএ-র ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল ভারতী বালাজিও এফসিআইয়ের চাল থেকে তৈরি ইথানলের ক্রয়মূল্য বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, উৎপাদন ও পরিচালন খরচ বেশি থাকায় বর্তমান মূল্যে উৎপাদকদের লাভের সুযোগ সীমিত।
২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের লক্ষ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে?
ভারতের ইথানল-ব্লেন্ডেড পেট্রোল বা ইবিপি কর্মসূচির লক্ষ্য হল পেট্রোলে ইথানলের মিশ্রণ বাড়িয়ে ২০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে জ্বালানি খাতের সংযোগ মজবুত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এআইডিএ-র মতে, এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে উৎপাদনকারীদের জন্য আর্থিকভাবে কার্যকর ক্রয়মূল্য, উপযুক্ত প্রণোদনা এবং কাঁচামাল ব্যবহারে বাস্তবসম্মত নমনীয়তা জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকলে নতুন বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, এই বিষয়গুলি নিয়ে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক, খাদ্য ও গণবণ্টন দফতর, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। তবে ক্রয়মূল্য বা প্রণোদনা বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষিত হয়নি।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business