ভারতের অটোমোবাইল শিল্পে এআই যুদ্ধের আসল শক্তি ডেটা
নয়াদিল্লি: একসময় ভারতে গাড়ি (Automotive Industry) কেনার সময় পাওয়ার উইন্ডো বা ক্যাসেট প্লেয়ারের মতো সুবিধাই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করত। পরে গাড়ির পরিচিত ফিচারের তালিকায় যুক্ত হয় রিভার্সিং ক্যামেরা ও অ্যান্ড্রয়েড অটো। এখন ক্রেতাদের প্রত্যাশা আরও এগিয়েছে। তাঁরা চান ওভার-দ্য-এয়ার সফটওয়্যার আপডেট, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং এমন প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে গাড়ি কেনার পরেও তার কার্যক্ষমতা ও ফিচার উন্নত হতে থাকবে। ফলে অটোমোবাইল শিল্পে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং বিপুল পরিমাণ ডেটা।
এই পরিবর্তন শুধু চার চাকার গাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বৃহত্তম টু-হুইলার বাজার ভারতেও দ্রুত বদলাচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার। দেশীয় একাধিক স্টার্টআপ শুরু থেকেই নিজস্ব সফটওয়্যার, সংযুক্ত প্রযুক্তি এবং রিয়েল-টাইম টেলিমেট্রি-সহ ইলেকট্রিক স্কুটার ও মোটরসাইকেল তৈরি করছে। অর্থাৎ, সফটওয়্যার-নির্ভর যানবাহন বা সফটওয়্যার-ডিফাইন্ড ভেহিকল এখন আর পরীক্ষামূলক ধারণা নয়, ভারতের বাজারেও তা বাস্তব উৎপাদনের অংশ হয়ে উঠছে।
একই সময়ে অটোমোবাইল সংস্থাগুলিকে সামলাতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন, শুল্কনীতি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং এআই-এ বিনিয়োগের আর্থিক ফল দেখানোর চাপ। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে থাকা ডেটাকে এক জায়গায় এনে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।
গাড়ির ডেটা বাড়ছে, কিন্তু সব তথ্য কাজে লাগছে কি?
একটি সংযুক্ত গাড়ি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ গিগাবাইট ডেটা তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতে সংযুক্ত প্রযুক্তিযুক্ত যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারের অংশ এক বছরে ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ শতাংশ হয়েছে। এই বিভাগে বিক্রির পরিমাণও বছরে ৬০ শতাংশ বাড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, নতুন ইলেকট্রিক টু-হুইলারের প্রায় সবগুলিতেই টেলিমেট্রি প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে।
এই বিপুল ডেটার মধ্যে রয়েছে গাড়ির পারফরম্যান্স, ব্যাটারির অবস্থা, চালানোর ধরন, যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা এবং ত্রুটির তথ্য। কিন্তু সমস্যা হল, এই তথ্যের বড় অংশ যথাসময়ে সেই ইঞ্জিনিয়ার, কারখানা পরিচালনাকারী বা পরিকল্পনাকারীদের কাছে পৌঁছয় না, যাঁরা তা ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
অটোমোবাইল সংস্থার ইঞ্জিনিয়ারিং, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিলারশিপ এবং গ্রাহক পরিষেবা বিভাগ প্রায়ই আলাদা সফটওয়্যার ও ডেটাবেস ব্যবহার করে। চেন্নাই, পুনে এবং সানন্দের মতো বিভিন্ন উৎপাদনকেন্দ্র জুড়ে কাজ করা সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে এই বিচ্ছিন্নতা আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
সমাধান হিসেবে শুধু আরও বেশি ডেটা সংগ্রহ করলেই হবে না। বরং গাড়ির টেলিমেট্রি, কারখানার গুণমান সংক্রান্ত তথ্য, সরবরাহকারীদের পারফরম্যান্স এবং ডিলারদের প্রতিক্রিয়াকে একটি অভিন্ন ও নিয়ন্ত্রিত ডেটা ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। এতে প্রতিটি বিভাগ একই নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
উদাহরণস্বরূপ, রাস্তায় চলা কোনও গাড়িতে একই ধরনের ত্রুটি বারবার দেখা দিলে সেই তথ্য দ্রুত ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার এবং উৎপাদন পরিকল্পনাকারীর কাছে পৌঁছনো উচিত। তা হলে সমস্যার কারণ শনাক্ত করা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সংশোধন আনার সময় কয়েক মাস থেকে কয়েক দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এই সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব গাড়ি, যন্ত্রাংশ বা উৎপাদন ব্যবস্থার ভার্চুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করে তার আচরণ বিশ্লেষণ করা হয় ডিজিটাল টুইনের মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রতিরূপ যদি শুধু একটি বিভাগের পুরনো ডেটার উপর নির্ভর করে, তা হলে তার কার্যকারিতা সীমিত থাকে। বিভিন্ন বিভাগ থেকে নিয়মিত হালনাগাদ হওয়া তথ্য যুক্ত হলে ডিজিটাল টুইন আরও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে সাহায্য করতে পারে।
সরবরাহ ব্যবস্থা শুধু বড় নয়, আরও বুদ্ধিমান হতে হবে
ভারতের অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ শিল্প ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ৮৬ বিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পাঁচ বছরে এই শিল্পের আকার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। রফতানির পরিমাণ পৌঁছেছে ২৪ বিলিয়ন ডলারে। শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ৭০ শতাংশেরও বেশি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয় বলেও উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে, ভারতে ইলেকট্রিক গাড়ির বিক্রি বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ২৬.৬ লক্ষ ইউনিটে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিটি নতুন ইভির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, মোটর কন্ট্রোলার এবং সংযুক্ত ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি। ফলে গাড়ির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি প্রতিটি গাড়ি থেকে তৈরি হওয়া ডেটার পরিমাণ ও জটিলতাও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু একটি সংস্থার অভ্যন্তরে ডেটা সংযোগ তৈরি করলেই চলবে না। গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা, প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এবং লজিস্টিকস সংস্থাগুলির মধ্যেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এমন একটি ব্যবস্থায় প্রতিটি সংস্থা ঠিক করতে পারবে কোন তথ্য তারা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করবে। একই সঙ্গে গুণমান সংক্রান্ত সতর্কবার্তা, চাহিদার পরিবর্তন এবং মজুতের পরিমাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে পৌঁছতে পারবে।
ধরা যাক, কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ হঠাৎ কমে গেল অথবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি রাতারাতি বদলে গেল। যে উৎপাদক আগে পরিস্থিতি বুঝে বিকল্প সরবরাহকারী, উৎপাদন পরিকল্পনা বা পরিবহণের ব্যবস্থা করতে পারবে, সে প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাবে। আর তার জন্য দরকার আগে থেকেই সংযুক্ত অংশীদার এবং নির্ভরযোগ্য ডেটা।
কারখানা থেকে শেষ গন্তব্য, সর্বত্র এআইয়ের সুযোগ
ভারত পিএম গতি শক্তি এবং জাতীয় লজিস্টিকস নীতির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক, মালবাহী করিডর এবং বিভিন্ন পরিবহণ ব্যবস্থার সংযোগ বাড়াচ্ছে। এই পরিকাঠামো পণ্য পরিবহণ সহজ করে। কিন্তু কোন পথে পণ্য পাঠানো হবে, কোথায় বিলম্ব হতে পারে এবং কোন গাড়ির কখন রক্ষণাবেক্ষণ দরকার, সেই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে ডেটা।
বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই বহু ট্রাকের অবস্থান, জ্বালানি খরচ, ইঞ্জিনের স্বাস্থ্য এবং চালকের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর সঙ্গে এআই যুক্ত হলে রুট পরিকল্পনা, পূর্বাভাসভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণ, চাহিদার পূর্বানুমান এবং ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনও ট্রাকে যান্ত্রিক ত্রুটির লক্ষণ দেখা দিলে এআই ব্যবস্থা আগেভাগে সতর্কবার্তা দিতে পারে। আবার রাস্তায় যানজট বা অন্য কোনও বাধা তৈরি হলে বিকল্প পথে গাড়ি পাঠানোর পরামর্শও দিতে পারে। এতে পণ্য পৌঁছতে দেরি, অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি খরচ এবং মাঝপথে গাড়ি বিকল হওয়ার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
ভারত যখন আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে, তখন সংযুক্ত ডেটা ব্যবস্থার উপর বিনিয়োগ পরিবহণ খরচ ও পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এআইয়ের উপর আস্থা তৈরিতে ডেটার গুণমানই আসল
এতদিন এআইয়ের প্রধান ব্যবহার ছিল কোথায় উৎপাদনে বাধা তৈরি হচ্ছে তা শনাক্ত করা, যন্ত্রাংশের ত্রুটির পূর্বাভাস দেওয়া কিংবা অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করা। এখন এআই ব্যবস্থা উৎপাদনের সময়সূচি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গ্রাহক পরিষেবার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন কার্যকর করার কাজও স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা সম্ভব।
কিন্তু এআইয়ের পরামর্শের উপর নির্ভর করতে হলে তার ব্যবহৃত তথ্য নির্ভরযোগ্য হওয়া জরুরি। ভুল, অসম্পূর্ণ বা পুরনো ডেটার উপর তৈরি মডেল ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারে। তাই ডেটার গুণমান, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের নিয়ম এখন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার অন্যতম শর্ত।
এই ক্ষেত্রে অটোমোবাইল সংস্থাগুলির জন্য তিনটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে থাকা ডেটাকে এমন একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে, যা বিপুল পরিমাণ ও বিভিন্ন ধরনের তথ্য সামলাতে পারে। দ্বিতীয়ত, সংস্থার অভ্যন্তরে এবং অংশীদারদের সঙ্গে তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিয়ম ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, এমন এআই মডেল তৈরি করতে হবে, যেগুলির সিদ্ধান্তের ভিত্তি অনুসরণ, পরীক্ষা এবং নিরীক্ষা করা সম্ভব।
ভারতের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন বা ডিপিডিপি আইন এই প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক গুরুত্ব যোগ করেছে। তবে শুধু আইন মেনে চলাই যথেষ্ট নয়। ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য দ্রুত, নির্ভুল এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অটোমোবাইল শিল্পে এআই প্রতিযোগিতার নির্ণায়ক কী?
আগামী দিনে অটোমোবাইল শিল্পে কারা প্রথম এআই প্রকল্প ঘোষণা করল, তা দিয়ে নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে না। বরং যে সংস্থাগুলি নির্ভরযোগ্য ডেটা পরিকাঠামো তৈরি করতে পারবে, তাদের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি। উৎপাদন লাইনে যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং ও গুণমানের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা জরুরি, তেমনই এআইয়ের ক্ষেত্রেও তথ্যের নির্ভুলতা এবং যাচাইযোগ্যতা অপরিহার্য।
গত কয়েক বছরে শিল্পে এআই কী করতে পারে, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, সংস্থাগুলি এআইকে ঠিক কতটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে প্রস্তুত এবং সেই সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখার মতো ডেটা ব্যবস্থা তারা তৈরি করেছে কি না।
ভারতের অটোমোবাইল শিল্পের ভবিষ্যৎ তাই শুধু উন্নত প্রসেসর, সংযুক্ত গাড়ি বা স্মার্ট কারখানার উপর নির্ভর করবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে ডিলারশিপ এবং গাড়ি বিক্রির পরের পরিষেবা পর্যন্ত ডেটা কতটা কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ করছে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে এআই প্রতিযোগিতার অন্যতম নির্ণায়ক।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business