বিশ্বের কঠিনতম সামরিক টহল মহড়ায় সোনা ভারতীয় সেনার অসম রেজিমেন্টের
বিশ্বের অন্যতম কঠিন সামরিক টহল মহড়া ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোল ২০২৬-এ সোনার পদক জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করল ভারতীয় সেনাবাহিনীর অসম রেজিমেন্ট। ব্রিটেনের ওয়েলসে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক মহড়ায় বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভারতীয় সেনার দলটি। এই বছর সোনার পদক পাওয়া ১০টি দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে তারা।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফে জানানো হয়েছে, এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে সেনাদের অসাধারণ শারীরিক সহনশীলতা, কৌশলগত দক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং দলগত সমন্বয়। কঠিন ভূখণ্ডে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে নির্ধারিত সামরিক কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে অসম রেজিমেন্টের সদস্যরা নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর মতে, এই ফলাফল তাদের কঠোর প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার দক্ষতার প্রতিফলন।
কী এই ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোল মহড়া?
ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়া। বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে সেনাদের কার্যক্ষমতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত দক্ষতা যাচাই করাই এই মহড়ার প্রধান উদ্দেশ্য।
সাধারণত একটি টহলদলে আটজন সেনা সদস্য থাকেন। তাঁদের প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালাতে হয়। এই সময় প্রত্যেক সেনাকে সর্বোচ্চ ৩২ কিলোগ্রাম পর্যন্ত সরঞ্জাম বহন করে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হতে পারে।
শুধু দীর্ঘ পথ হাঁটলেই এই মহড়ায় সাফল্য পাওয়া যায় না। বরং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে একাধিক জটিল সামরিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে শত্রুপক্ষের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, মানচিত্র ও দিকনির্দেশ ব্যবহার করে পথ নির্ণয়, আহত সেনাকে উদ্ধার এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এ ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম, মাইনফিল্ডের মতো বিপজ্জনক এলাকা মোকাবিলা, যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখা, আর্টিলারির লক্ষ্য নির্ধারণ সংক্রান্ত পদ্ধতি এবং রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক হুমকির মোকাবিলার মতো বিষয়ও মহড়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কেন এই মহড়া এত কঠিন?
ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোলে সেনাদের একসঙ্গে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ভারী সরঞ্জাম, সীমিত সময় এবং ক্রমাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপের মধ্যে দলকে কাজ করতে হয়। ফলে এখানে শুধু শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক দৃঢ়তা এবং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সমন্বয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দলের কোনও সদস্য সমস্যায় পড়লে অন্যদের দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিতে হয়। আবার তথ্য সংগ্রহ, পথ নির্বাচন এবং সম্ভাব্য বিপদের মোকাবিলায় ভুল হলে পুরো অভিযানের ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ড্রোন, দীর্ঘক্ষণ নজরদারি এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যান্য হুমকি সম্পর্কিত পরিস্থিতিও মহড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে পরিবর্তিত যুদ্ধপরিস্থিতিতে ছোট সামরিক দলের কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একই বছরে একাধিক দল পায় সোনার পদক
ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোল কোনও সাধারণ দৌড় প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে শুধু একটি দল বিজয়ী হয়। এখানে নির্দিষ্ট সামরিক প্রশিক্ষণের মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি দলের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হয়।
সাফল্যের স্তর অনুযায়ী সোনা, রুপো এবং ব্রোঞ্জের পদক দেওয়া হয়। পদক পাওয়ার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে না পারলেও যে দল নির্ধারিত অভিযান সম্পন্ন করে, তারা অংশগ্রহণ বা সমাপ্তির স্বীকৃতি পেতে পারে।
এই কারণেই একই বছরে একাধিক দল সোনার পদক জিততে পারে। ২০২৬ সালের মহড়ায় বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দলের মধ্যে ১০টি দল সোনা পেয়েছে। সেই তালিকায় অসম রেজিমেন্টের অন্তর্ভুক্তি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোলে ভারতীয় সেনার পুরনো সাফল্য
এই প্রথম নয়, এর আগেও ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোলে একাধিকবার পদক জিতেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। বিশেষ করে গোর্খা রাইফেলস এবং গাড়োয়াল রাইফেলসের বিভিন্ন ইউনিট অতীতে উল্লেখযোগ্য ফল করেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় সেনার সাফল্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হল:
- ২০০৭: ৫ম ব্যাটালিয়ন, ১ম গোর্খা রাইফেলস সোনার পদক জেতে।
- ২০১০: ৪/৯ গোর্খা রাইফেলস সোনা পায়।
- ২০১১: ভারতীয় সেনার আরেকটি দল সোনার পদক জেতে।
- ২০১৪: গাড়োয়াল রাইফেলসের ৮ম ব্যাটালিয়ন সোনা অর্জন করে।
- ২০১৫: ৩য় ব্যাটালিয়ন, ৪র্থ গোর্খা রাইফেলসের ঘাতক প্যাট্রোল রুপোর পদক পায়।
- ২০১৬: ২য় ব্যাটালিয়ন, ৮ম গোর্খা রাইফেলস সোনা জেতে।
- ২০২১: ৪র্থ ব্যাটালিয়ন, ৫ম গোর্খা রাইফেলস (ফ্রন্টিয়ার ফোর্স) সোনার পদক পায়। সেই বছর ৯৬টি প্যাট্রোল দলের মধ্যে ১৭টি আন্তর্জাতিক দল ছিল।
- ২০২৫: গাড়োয়াল রাইফেলসের ১৩তম ব্যাটালিয়ন রুপোর পদকপ্রাপকদের মধ্যে ছিল।
এই ধারাবাহিক সাফল্য আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়ায় ভারতীয় সেনার প্রশিক্ষণ, দলগত দক্ষতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করার ক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
১৯৫৯ সালে শুরু হয়েছিল ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোল
ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোলের সূচনা হয় ১৯৫৯ সালে। ওয়েলসের টেরিটোরিয়াল আর্মির সেনারা প্রাথমিক সৈনিকসুলভ দক্ষতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে এই প্রশিক্ষণ মহড়া শুরু করেছিলেন। প্রথম দিকে এর মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘ পথ অতিক্রমের সহনশীলতা, নেতৃত্ব, দিকনির্ণয়, দলগত কাজ এবং নিশানার দক্ষতা পরীক্ষা করা।
প্রাথমিক পর্যায়ে ওয়েলসের দুর্গম এলাকায় দীর্ঘ পদযাত্রার পর শুটিং অনুশীলন করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মহড়া আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে। ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের সেনাদল এতে অংশ নিতে শুরু করে। পাকিস্তান, আমেরিকা, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশের দলও এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে।
বর্তমানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ১৬০তম ওয়েলশ ব্রিগেড মধ্য ওয়েলসের ব্রেকন বিকনস নামে পরিচিত এলাকায় এই মহড়া পরিচালনা করে।
অসম রেজিমেন্টের সাফল্যে ভারতীয় সেনার মর্যাদা বৃদ্ধি
ক্যামব্রিয়ান প্যাট্রোল ২০২৬-এ অসম রেজিমেন্টের সোনার পদক জয় শুধু একটি প্রতিযোগিতায় সাফল্য নয়, বরং কঠিন পরিস্থিতিতে সামরিক দক্ষতা প্রদর্শনের স্বীকৃতি। দীর্ঘ পথ অতিক্রম, ভারী সরঞ্জাম বহন, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলগত সমন্বয়ের মতো একাধিক পরীক্ষায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে অংশগ্রহণকারী সেনাদের।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই সাফল্য অর্জন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বের পরিচয় তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়ায় এমন ফল ভবিষ্যতেও ভারতীয় সেনার সক্ষমতা এবং সহযোগিতামূলক প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে আরও সামনে নিয়ে আসবে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।