‘অর্ডার ক্লোজ়ড’ বোর্ড অতীত, এখনও দর্জিরা কাটপিসের অপেক্ষায় - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘অর্ডার ক্লোজ়ড’ বোর্ড অতীত, এখনও দর্জিরা কাটপিসের অপেক্ষায়

Spread the love

এই সময়: দুটো শব্দের নোটিস, ঠিক দুটো শব্দের। ‘অর্ডার ক্লোজ়ড’ কিংবা ‘অর্ডার বন্ধ’।

একটা সময় ছিল, পুজোর মাস খানেক আগেই দর্জির দোকানের সামনে ঝুলে যেত এক টুকরো পিচবোর্ডে লেখা ওই ছোট্ট নোটিস। অর্ডার নেওয়া বন্ধ, কিন্তু দোকানের ভিতরে তখন সেলাই মেশিনের শব্দ বন্ধ হতো না। দিন-রাতের হিসেব ভুলে ২৪ ঘণ্টা কাজ। দু’জন টানা জামা-প্যান্ট সেলাই করছেন, আর মেঝেতে পড়ে থাকা কাটা কাপড়ের স্তূপের মধ্যে কোনও রকমে জায়গা করে ঘুমোচ্ছেন আরও দু’জন। কয়েক ঘণ্টা পরে ঘুম ভেঙে তাঁরাই কাজে বসবেন, আর অন্য দু’জন সেই সময়ে চোখ বুজবেন। ঘুম, খাওয়া, একটু গল্প— সবই চলত সেলাইয়ের ফাঁকে। শুধু সেলাই মেশিনের বিশ্রাম ছিল না। মধ্যরাতেও বন্ধ দোকানের ভিতর থেকে ভেসে আসত পায়ে-চালানো মেশিনের টানা ছন্দোবদ্ধ আওয়াজ।

কলকাতায় পুজোর ভরা বাজারে সেই দর্জির দোকান এখন আর নেই বললেই চলে। পাল্টে গিয়েছে পোশাক কেনার অভ্যাস, পাল্টে গিয়েছে বাজারের চরিত্রও। রেডিমেড পোশাকের একটি তৈরি বাজার বহু বছর ধরেই ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাজারের শক্তি আরও বেড়েছে। তার সঙ্গে ‘ফ্রি সাইজ়’ পোশাকের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বাড়ায় কাট পিস কিনে পাড়ায় অথবা নিউ মার্কেটে কিংবা ধর্মতলায় দর্জির কাছে গিয়ে ঠিকঠাক ‘ফিটিংস’–এর জন্য মাপ দেওয়ার প্রয়োজনও কমতে শুরু করে। তার পরেও কোনও রকমে টিকে ছিলেন দর্জিরা। কিন্তু ‘রিটেল চেন’-এর যুগ শুরু হলে দর্জিরা খুব বেশি ধাক্কা খেলেন।

একদা অতীতে পুজোর আগে কাজের চাপে যাঁদের খাওয়া ও ঘুমোনোর সময় কার্যত ছিল না, এখন তাঁদের ঘুম উড়েছে ভবিষ্যতের চিন্তায়। প্রায় চার দশক ধরে দর্জির দোকান চালাচ্ছেন শ্যামবাজারের শশাঙ্ক দাস। বাজারের উত্থান–পতন কম দেখেননি ওই প্রৌঢ়। তবে গত কয়েক বছরের পরিস্থিতিতে তিনি রীতিমতো আতঙ্কিত। শশাঙ্ক বলছেন, ‘যাঁরা মহিলাদের পোশাক তৈরি করেন, তাঁদের বাজার রয়েছে। কিন্তু ছেলেদের জামা-প্যান্ট তৈরি করানোর বাজার প্রায় শেষ। খদ্দেরের সংখ্যা এক রকম তলানিতেই।’

তবে খদ্দেরের সংখ্যা কমে যাওয়ার পিছনে দর্জির দোকানের ‘অস্বাভাবিক’ চার্জকেও দায়ী করছেন অনেকে। ফার্ন রোডে বাড়ি, মধ্য পঞ্চাশের নীলেশ মুখোপাধ্যায় বহু বছর ধরে নিউ মার্কেটের একটি নির্দিষ্ট টেলরের কাছ থেকে শার্ট ও ট্রাউজ়ার্স বানান। তিনি বলছেন, ‘আমি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বাবার সঙ্গে গিয়ে নিউ মার্কেটের ইয়াসিন মাস্টারের কাছে জামাকাপড় করাই। কিন্তু এখন সেখানে একটা জামা বানাতে ৫০০ টাকা এবং একটি ট্রাউজ়াস বানাতে পড়ছে ৭৫০ টাকা। এতটা খরচ বড্ড গায়ে লাগে। কাট পিসের দাম তো আলাদা।’

মহিলাদের পোশাকের টেলরদের বাজার অবশ্য এখনও ভালো। গড়িয়াহাট মার্কেটের হাফিজুল লস্করের বক্তব্য, ‘মহিলাদের পোশাক তৈরির অর্ডার থাকে সারা বছর। পুজোয় কাজ আরও বাড়ে। ব্লাউজ় তৈরির চার্জ ৬০০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত, সালোয়ার কামিজ় শুরু হচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে। তা ছাড়া, শাড়িতে ফল্‌স এবং পিকো করানোর কাজ তো আছেই। অনেকেই পুরুষদের পোশাক বানানো ছেড়ে লেডিজ় টেলরিংয়ের কাজে সরে এসেছেন।’ যাঁরা সেটা পারেননি, তাঁরা বিভিন্ন শপিং মল–এ একসঙ্গে তিন-চারটি পোশাকের বিপণিতে সেলাইয়ের কাজ করে কোনও মতে টিকে রয়েছেন। তবে সেটাও বা কতদিন পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

যে পেশায় এক সময়ে পুজোর মরশুম মানেই ছিল দিন-রাত এক করে কাজ, দেরি হয়ে গেলে অর্ডার না–নেওয়ার নোটিস ঝোলানো, সেই পেশাতেই এখন অর্ডারের কাতর অপেক্ষা। পুজোর বাজারে পোশাকের রং পাল্টেছে, কেনাকাটার ধরন পাল্টেছে এবং পাল্টেছে মানুষের পছন্দও। কিন্তু এ সবের সঙ্গেই কলকাতায় নিঃশব্দে অতীত হয়ে গেল দর্জির দোকানের সেই চেনা ব্যস্ততা, রাতজাগা সেলাই মেশিনের টানা শব্দ আর দরজায় ঝোলানো পিচবোর্ডের টুকরোয় লেখা নোটিস—‘অর্ডার ক্লোজ়ড’।

ঝর্না কলম, অডিয়ো ক্যাসেট, টাইপরাইটারের মতো কলকাতায় দর্জির দোকানও যেন এখন শুধুই নস্ট্যালজিয়ার উপকরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *