দালাল স্ট্রিট–এ রক্তক্ষরণ, উবে গেল ১০ লক্ষ কোটি
এই সময়: বিশ্বজুড়ে ক্রমশ চড়ছে বন্ড ইল্ড, ডলারের নিরিখে সস্তা হয়ে চলেছে টাকার ভ্যালুয়েশন, গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় সংস্থাগুলির শেয়ার বিক্রি করে চলেছেন.. তালিকাটা ক্রমশ লম্বা হয়ে চলেছে। একাধিক ক্ষেত্র থেকে ধাক্কায় জেরবার দালাল স্ট্রিট-এর বিনিয়োগকারীদের উপরে এ বার নয়া আঘাত হেনেছেন আরবিআই কর্তৃপক্ষ। দেশজুড়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে গত বুধবারই আরবিআই গভর্নর ঘোষণা করেছেন, তাঁরা রেপো রেট ০.২৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার লগ্নিকারীদের একাংশের বিক্রির চাপে দালাল স্ট্রিট-এর অন্যতম প্রধান দুই সূচক সেনসেক্স-নিফটির ‘ক্ষত’ আরও গভীর হলো। যার জেরে এক দিনেই বাজার থেকে উবে গেল বিনিয়োগকারীদের দশ লক্ষ কোটি টাকার মূলধন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আগামী দিনে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ রেপো রেট বাড়ালে তা বাজারের জন্য ‘বিয়ারিশ মার্কেট’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কেনার তুলনায় বিক্রির দিকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। যা আম লগ্নিকারীদের পোর্টফোলিওকে রেড জ়োন-এর দিকেই ঠেলবে। তবে যদি আগামী দিনে সুদের হারে কোনও বদল অথবা বিদেশি লগ্নিকারীরা বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করেন, সেই ক্ষেত্রে বাজারে বুলিশ ট্রেন্ড ফিরতে পারে। তবে সেনসেক্স-নিফটি আগামী দিনে কোন পথে হাঁটবে, তা বিভিন্ন পরিস্থিতির উপরে নির্ভর করবে। সেই জন্য ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী ইনভেস্টমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্ট বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিসংখ্যান বলছে, এ দিন সেনসেক্স ১,০৪৫ পয়েন্ট কমে থেমেছে ৭১,৫৯৩ পয়েন্টে। পাশাপাশি, নিফটি ৩৭১ পয়েন্ট কমে বন্ধ হয়েছে ২২,২৩১ পয়েন্টে। তবে এ দিন ইন্ট্রাডে ট্রেড-এ নিফটি নেমে যায় ২২,১৭৯ পয়েন্টে। যা সূচকটির এক বছরের নিরিখে তলানি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এ দিন শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকগুলিকে টেনে নামিয়েছে একাধিক ‘ফ্যাক্টর’। যার মধ্যে রয়েছে,
রেপো রেট বৃদ্ধি
উৎসবের মুখে আমজনতাকে মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে স্বস্তি দিতে সাড়ে তিন বছর পরে রেপো রেট (যে সুদের হারে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে ঋণ দেয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক) ০.২৫ শতাংশ বাড়িয়েছেন শীর্ষ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি, তাঁরা নিজেদের অবস্থানও বদল করেছেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আগামী দিনে প্রয়োজন হলে ফের সুদের হার বাড়ানোর ‘ইঙ্গিত’ রয়েছে আরবিআই-এর নয়া অবস্থানে। এ বিষয়ে মার্কিন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং সংস্থা জেফরিজ় কর্তৃপক্ষ তাঁদের অনুমানে জানিয়েছেন, আগামী দিনে আরবিআই কর্তৃপক্ষ ১০০ বেসিস পয়েন্ট তথা ১ শতাংশ পর্যন্ত রেপো রেট বৃদ্ধি করতে পারেন।
উল্লেখ্য, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় আগামী দিনে ব্যাঙ্কগুলির ফিক্সড ডিপোজ়িট-এ রিটার্ন আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একাংশ লগ্নির পথ পরিবর্তনও করতে পারেন। যা শেয়ারবাজারে লগ্নির ‘সেন্টিমেন্ট’-এর জন্য নেতিবাচক হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
চড়া বন্ড ইল্ড
বিশ্বজুড়েই ক্রমশ চড়ছে বন্ড ইল্ড। পরিসংখ্যান বলছে, ৩০ বছরের মার্কিন ট্রেজ়ারি বন্ড ইল্ড-এর হার পৌঁছেছে ৫.৭১ শতাংশে। পিছিয়ে নেই ১০ বছরের মার্কিন বন্ড ইল্ডও। যা সম্প্রতি ছুঁয়েছে ৫.৩ শতাংশ। দু’বছরের বন্ড ইল্ডও ৪.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে দালাল স্ট্রিট-সহ বিভিন্ন দেশের শেয়ার সূচকের তুলনায় বন্ড-এর সুদ বিদেশি বিনিয়োগকারী-সহ বড় বিনিয়োগকারীদের কাছে লোভনীয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়াও মার্কিন বন্ড ইল্ড বাড়তেই ডলারের সূচক চড়তে শুরু করেছে। যা পরোক্ষ ভাবে ডলারের নিরিখে টাকার ভ্যালুয়েশন কমিয়েছে। এ দিনও ডলারের দাম ১৩ পয়সা বেড়ে হয়েছে ৯৬.৮৮ টাকা। যার জেরে বিনিয়োগকারীদের একাংশ দালাল স্ট্রিট ছেড়ে ডলার ও বন্ড-এ লগ্নির দিকে ঝুঁকছেন বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
অপরিশোধিত তেলের দাম
গত কয়েক মাসে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে যুদ্ধের ‘ঝাঁঝ’ আরও বেড়েছে। ফলে বিশ্বের তৈলধমনী হরমুজ় পথে শিপমেন্ট-এ বারবার হামলার মুখে পড়েছে তেলের ট্যাঙ্কারগুলি। গত সপ্তাহেই কুয়েতের একটি তেলের ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে তেহরান। তার এক সপ্তাহ কাটার আগেই ফের আরও একটি ট্যাঙ্কার-এ হামলা চালানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম ব্যারেলপিছু ১০৪ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। ফলে ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিকারী দেশের বাজার থেকে শেয়ার বিক্রির পথ বেছে নিয়েছেন বিনিয়োগকারীদের একাংশ।
বিদেশি লগ্নি
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় দেশের বাজারে শেয়ার বিক্রি করে চলেছেন বিদেশি লগ্নিকারীরা। পরিসংখ্যান বলছে, গত বুধবার তাঁরা ৬,১২১ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। ওই দিন নিয়ে টানা ন’দিন তাঁরা শেয়ার বিক্রি করেছেন। ফলে তাঁদের নেট সেলিং-এর অঙ্ক পৌঁছেছে ৫৭,০০০ কোটি টাকার কাছে। যা শেয়ার সূচকগুলির উপরে বিক্রির চাপ বাড়িয়ে চলেছে।
ফেড রেট
গত মাসে ইউএস ফেডেরাল রিজ়ার্ভ কর্তৃপক্ষ তাঁদের পলিসি রেট ০.২৫ শতাংশ বাড়িয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যদি ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদী হয়, সেই ক্ষেত্রে ফেড কর্তৃপক্ষ ফের সুদের হার বাড়াতে পারেন। যা বিশ্বজুড়েই শেয়ারবাজারের উপরে বিক্রির চাপ তৈরি করবে।
আপনি কি বিনিয়োগ করবেন?
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আগামী দিনে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ রেপো রেট বাড়ালে তা বাজারের জন্য ‘বিয়ারিশ মার্কেট’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কেনার তুলনায় বিক্রির দিকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। যা আম লগ্নিকারীদের পোর্টফোলিওকে রেড জ়োন-এর দিকেই ঠেলবে। তবে যদি আগামী দিনে সুদের হারে কোনও বদল অথবা বিদেশি লগ্নিকারীরা বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করেন, সেই ক্ষেত্রে বাজারে বুলিশ ট্রেন্ড ফিরতে পারে। তবে সেনসেক্স-নিফটি আগামী দিনে কোন পথে হাঁটবে, তা বিভিন্ন পরিস্থিতির উপরে নির্ভর করবে। সেই জন্য ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী ইনভেস্টমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্ট বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।