‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ল্যান্ড করো, ওঁর হাতে সময় নেই…’, কী ভাবে গুরুতর আহত স্মিথকে বাঁচিয়েছিলেন চিকিৎসক?
মাঝআকাশে তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি। ককপিটের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। কো-পাইলটের কুঠারের আঘাতে ফালা ফাল হয়ে গিয়েছে হাত। সেই অবস্থাতেই সর্বশক্তি দিয়ে ফ্লাইট ও যাত্রীদের বাঁচাতে খুলে দিয়েছিলেন ককপিটের দরজা। যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণের চোটে বার বার অচেতন হয়ে পড়ছিলেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন। আর তাঁকে বাঁচাতে ফ্লাইটের ভিতরেই এক অসম লড়াইয়ে নামেন এক দন্তচিকিৎসক।
কোনও পর্যাপ্ত মেডিক্যাল ইকুয়েপমেন্ট ও কিট ছাড়া এমন গুরুতর আহত স্মিতকে প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন ডেন্টিস্ট শোটা মুসায়েভ। তাঁর টানা ৪৫ মিনিটের প্রচেষ্টাই বড় অঘটনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে। সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে এক সপ্তাহ পরেও শিউরে উঠছেন ওই দন্তচিকিৎসক। তাঁর কথায়, ‘এক সময়ে মনে হচ্ছিল, এখনই ফ্লাইট ল্যান্ড করাতে হবে, নইলে আমরা ওঁকে হারিয়ে ফেলব।’
স্ত্রীকে নিয়ে ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট FZ1073-এ তেল আভিভ যাচ্ছিলেন দন্তচিকিৎসক শোটা মুসায়েভ। মাঝআকাশে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হবেন তা ভাবতেই পারেননি ইজ়রায়েলের হলোনের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সি এই চিকিৎসক। কো-পাইলটের প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়ে তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন রক্তাক্ত স্মিত মচ্ছর।
৩৫,০০০ ফুট উঁচুতে স্মিতকে বাঁচিয়ে রাখতে মুসায়েভের হাতের কাছে ছিল না হাসপাতালের মতো কোনও চিকিৎসা সরঞ্জাম। রক্ত আটকাতে যাত্রীদের দেওয়া টি-শার্ট, বরফের প্যাকেট এবং প্রবল মানসিক জোরই ছিল সম্বল। তাঁর কথায়, ‘পাইলটের মাথা এবং বাঁ হাত থেকে তীব্র রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। হাত প্রায় কেটে পড়ে যাওয়ার মতো হয়েছিল। ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছিল রক্ত।’
ডেন্টিস্ট জানান, তাঁর প্রথম কাজ ছিল রক্তপাত বন্ধ করা। তিনি দ্রুত ক্ষতস্থানে চাপ দিয়ে ও টি-শার্ট দিয়ে বেঁধে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে স্মিতের রক্তচাপ কমতে শুরু করে। ধীরে ধীরে জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থায় চলে যাচ্ছিলেন তিনি। সেই সময়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। তাঁর কথায়, ‘কিছুতেই রক্ত পড়া থামছিল না। বাধ্য হয়ে আমি ক্রু সদস্যদের কাছে বরফ চাই। মাথাতেও গভীর ক্ষত ছিল। পুরো ৪৫ মিনিট ধরেই আমি ক্ষতস্থান চেপে ধরে থাকি।’ শোটার স্ত্রীও সাহায্য করেছিল বলে জানান তিনি।
চিকিৎসক জানান, বিমানের কেবিন ক্রুরা আক্রান্ত ক্যাপ্টেনকে ব্যথা কমার ওষুধ খাওয়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দম আটকে যাওয়া বা অচেতন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় মুসায়েভ তাতে বাধা দেন।
প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন মচ্ছর। শুধু রক্তপাত বন্ধ করাই নয়, স্মিত যাতে জ্ঞান না হারান, সেদিকেও নজর রাখছিলেন মুসায়েভ। বার বার তিনি পাইলটকে বলছিলেন, ‘দয়া করে ঘুমোবেন না, আপনাকে আমাদের প্রয়োজন।’
কথা চালানোর সময়েই স্মিত তাঁকে নিজের পরিচয় দেন। জানান, তিনি ভারতীয় এবং দুবাইয়ে থাকেন। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে বার বার সাহায্য চাইছিলেন তিনি। মুসায়েভের বর্ণনা অনুযায়ী, স্মিত বলেছিলেন,‘আমাকে সাহায্য করুন। আমি বাঁচতে চাই। আমি এখানে মরতে চাই না।’ শুনে মুসায়েভ বলেন, ‘আমি অনবরত তাঁকে বলছিলাম, ‘ভয় পাবেন না; আপনি নিজের পরিবারের কাছেই ফিরে যাবেন। আমরা খুব শীঘ্রই ল্যান্ড করছি…।’
তবে ঠিক অবতরণের আগে ফের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ক্যাপ্টেন মচ্ছরের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসকের কথায়,‘একপর্যায়ে তাঁর পালস বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁর পা দুটো কিছুটা ওপরের দিকে তুলে দিই এবং আস্তে আস্তে পালস স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তবে যখন দেখলাম তাঁর ঠোঁট নীল হয়ে আসছে, আমি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে বলি—আমাদের অবিলম্বে ল্যান্ড করতে হবে। তাঁর হাতে আর একদমই সময় নেই।’
অবশেষে ফ্লাইট তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করলে এবং চিকিৎসকরা ক্যাপ্টেনকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগে মুসায়েভ তাঁর কানে ফিসফিস করে বলেছিলেন,‘শুভকামনা বন্ধু, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে নিজের দেশে ফেরার পরে ডাঃ মুসায়েভ স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি একা নন, বরং মারাত্মক জখম হওয়ার পরেও ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণে রেখে সমস্ত যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন স্বয়ং ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। তাঁর কথায়, ‘স্মিত আমাদের সবার জীবন বাঁচিয়েছেন। স্মিতই আসল হিরো। আমার পরিবার এবং বিমানের সব যাত্রীর জীবন রক্ষা করার জন্য আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এটা হয়তো কর্মফল (Karma)— তিনি আমাদের বাঁচিয়েছেন, আর আমরা তাঁর প্রাণ রক্ষা করতে পেরেছি।’