যোধপুরের আকাশে গর্জে উঠল এফ-৩৫, রাফাল ও তেজস, নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনে ৮টি দেশ
রাজস্থানের যোধপুরে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বহুজাতিক বিমান মহড়া ‘তরঙ্গ শক্তি-২৬’ (Tarang Shakti-26) অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে চলছে। ২৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই মহড়াটি ১২ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এই মহড়ার মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘অংশীদারিত্বে শক্তি’। এর উদ্দেশ্য কেবল বিমান শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বিমান বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় সক্ষমতা, কার্যক্রমে যৌথ কার্যকারিতা এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করা।
‘তরঙ্গ শক্তি-২৬’-এর পরিচালনগত পর্যায়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাশাপাশি সাতটি বিদেশি দেশের বিমানবাহিনীও অংশ নিচ্ছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা; অর্থাৎ, ভারতের বিমানবাহিনীসহ মোট আটটি দেশের বিমানবাহিনী এই অনুশীলনে সরাসরি যুক্ত রয়েছে। এছাড়া, আরও ৩২টি দেশ এই অনুশীলন পর্যবেক্ষণ করছে।
যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি অন্যান্য বিমান
যুদ্ধবিমান ছাড়াও এই মহড়ায় এয়ারলিফট (বিমানযোগে পরিবহন), আকাশে জ্বালানি ভরার ব্যবস্থা এবং সহায়তা প্রদানকারী বিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অংশগ্রহণকারী বিদেশি বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে এফ-৩৫ লাইটনিং ২, রাফাল, এফ-১৬, এ৪০০এম, এমআরটিটি, সি-১৩০, সি-১৩০জে এবং কেসি-৩০এ।
আকাশজুড়ে এফ-৩৫, রাফাল ও তেজসের দাপট
‘তরঙ্গ শক্তি-২৬’ (Tarang Shakti-26)-এর প্রধান আকর্ষণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫এ লাইটনিং-২ (F-35A Lightning II) যুদ্ধবিমান। যোধপুরে এসে পৌঁছেছে ছয়টি এফ-৩৫এ বিমান, যা প্রথমবারের মতো ভারতের মাটিতে কোনো সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের কেসি-১৩৫ (KC-135) ট্যাঙ্কার বিমানগুলোও এই মহড়ার অংশ হয়েছে।
এফ-৩৫ (F-35) এবং ভারতীয় যুদ্ধবিমানের যৌথ উড্ডয়ন এই মহড়াকে বিশেষ করে তুলেছে। ভারতীয় পক্ষের বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান – যার মধ্যে রয়েছে সু-৩০ এমকেআই (Su-30MKI), রাফাল (Rafale) এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস (Tejas) – এতে অংশ নিচ্ছে। এফ-৩৫, রাফাল, সু-৩০ এমকেআই এবং তেজসের একসঙ্গে উড্ডয়নের দৃশ্য ভারতীয় আকাশে আধুনিক বিমানশক্তির এক অসাধারণ চিত্র তুলে ধরছে।
কোন কোন বিদেশি যুদ্ধবিমান এসে পৌঁছেছে?
‘তরঙ্গ শক্তি-২৬’ (Tarang Shakti-26) বিভিন্ন দেশের বিমান শক্তি এবং সহায়তা সক্ষমতার এক বৈচিত্র্যময় সমাহার তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্র: এফ-৩৫এ লাইটনিং ২ (F-35A Lightning II) এবং কেসি-১৩৫ (KC-135)
ফ্রান্স: রাফাল (Rafale), এ৪০০এম (A400M) এবং এমআরটিটি (MRTT)
জার্মানি: এ৪০০এম (A400M)-সহ বিমান চলাচলের সক্ষমতা (Air mobility capabilities)
অস্ট্রেলিয়া: আকাশপথে পরিবহন ও সহায়তা সক্ষমতা
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি: আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা (এফ-১৬ সহ)
বাংলাদেশ: সি-১৩০জে (C-130J)
শ্রীলঙ্কা: আকাশপথে সহায়তা ও পরিবহন সক্ষমতা
শুধুমাত্র উড্ডয়ন নয়: যুদ্ধের প্রস্তুতি
‘তরঙ্গ শক্তি’ (Tarang Shakti)-র লক্ষ্য কেবল যুদ্ধবিমানের ফরমেশন ফ্লাইট বা এয়ার শো-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিধি অনেক বিস্তৃত- যার মধ্যে রয়েছে যৌথ মিশন পরিকল্পনা, উড্ডয়ন কার্যক্রম, পরিচালনগত পদ্ধতির বোঝাপড়া, মিশন-পরবর্তী পর্যালোচনা এবং পেশাগত দক্ষতার আদান-প্রদান। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিভিন্ন দেশের পাইলট ও এয়ারক্রু-রা এখানে শিখছেন কীভাবে যৌথভাবে মিশন পরিচালনা করা যায় – যদিও তাঁদের ব্যবহৃত যুদ্ধবিমান, সেন্সর, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিচালনগত কার্যপ্রণালীতে ভিন্নতা রয়েছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই পারস্পরিক সমন্বয় ও কার্যক্ষমতার সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের জন্য এটি কেন তাৎপর্যপূর্ণ?
আধুনিক যুদ্ধপদ্ধতিতে বিমান শক্তির সংজ্ঞা কেবল যুদ্ধবিমানের সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষমতা, আকাশে জ্বালানি ভরার ব্যবস্থা, আকাশপথে পরিবহন (এয়ারলিফট), নজরদারি এবং নেটওয়ার্কিংয়ের মতো সক্ষমতাগুলো। ‘তরঙ্গ শক্তি’ (Tarang Shakti) ভারতীয় বিমান বাহিনীকে বিভিন্ন দেশের এই সক্ষমতাগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে জানার ও বোঝার সুযোগ করে দেয়।
বিমান-কূটনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ
ভারতের বিমান-কূটনীতির ক্ষেত্রে ‘তরঙ্গ শক্তি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ (F-35), ফ্রান্সের রাফাল (Rafale), ইউরোপীয় এয়ারলিফট বা পরিবহন বিমান এবং ভারতের সু-৩০ এমকেআই (Su-30MKI), রাফাল ও তেজস-এর মতো বিমানগুলো একই বিমানঘাঁটি থেকে যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর ফলে ভারত কেবল তার বিমান-শক্তি ও নিজস্ব মহাকাশ-প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগই পাচ্ছে না, বরং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সাথে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও সুদৃঢ় করারও সুযোগ লাভ করছে।
৩২টি পর্যবেক্ষক দেশ
এই মহড়ায় পর্যবেক্ষক হিসেবে আরও ৩২টি দেশ অংশ নিচ্ছে। এর অর্থ হলো, ‘তরঙ্গ শক্তি’ (Tarang Shakti)-র পরিধি কেবল সরাসরি বিমান পরিচালনাকারী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে ভারতের বিমান শক্তি, কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতি এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে গড়ে ওঠা ক্রমবর্ধমান মহাকাশ ও বিমান-প্রযুক্তি সক্ষমতা প্রত্যক্ষ ও অনুধাবন করার সুযোগ করে দেয়।