শিয়ালদহ শাখার এই রুটে রয়েছে ৮টি হল্ট, যা জুড়েছে ভারত-বাংলাদেশকেও, জানুন সেই ইতিহাস

আমাদের রাজ্যে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, শিয়ালদহ শাখার এমনই একটি লোকাল রুটের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে ১৬০ বছরেরও বেশি পুরোনো এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস? যে পথটি কেবল শহর আর গ্রামকে জোড়েনি, যুক্ত করেছিল ভারত ও বাংলাদেশকেও।

কথা হচ্ছে নদিয়া জেলার রানাঘাট থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গেদে পর্যন্ত বিস্তৃত ৩২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ নিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ একটি শাখা লাইন মনে হতে পারে। অথচ একসময় এটিই ছিল কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ ও তৎকালীন পূর্ববঙ্গে যাতায়াতের প্রাণকেন্দ্র।

এই রুটের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৬২ সালে, ব্রিটিশ আমলের ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে’-র হাত ধরে। তখন শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পরবর্তীকালে এই ঐতিহাসিক রেলপথটি যুক্ত হয় তৎকালীন বিখ্যাত ‘কলকাতা–শিলিগুড়ি মেন লাইন’-এর সঙ্গে।

দেশভাগের আগে এই পথ দিয়েই ছুটত একের পর এক নামী দূরপাল্লার ট্রেন। ঐতিহাসিক ‘দার্জিলিং মেল’ একসময় শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে রানাঘাট, গেদে, দর্শনা, বিখ্যাত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও ঈশ্বরদী হয়ে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে পৌঁছত। এ ছাড়া ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস ও ইস্ট বেঙ্গল মেল-এর মতো ট্রেনও নিয়মিত চলত এই রুটে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই পথটির মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দেয়। একটানা পথটি কেটে দু’ভাগ হয়ে যায়। ভারতের দিকে সীমানার শেষ স্টেশন হয়ে দাঁড়ায় গেদে, আর বাংলাদেশের দিকে ওপারেই শুরু হয় দর্শনা।

শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত অংশে ১৯৬৩-৬৪ সালে বিদ্যুৎ চলে এলেও, গেদে পর্যন্ত বিদ্যুৎচালিত ট্রেন পৌঁছতে সময় লেগেছিল অনেকটাই। ১৯৯৭-৯৮ সালে এই পথে কারেন্ট আসে এবং আধুনিক লোকাল ট্রেন পরিষেবা চালু হয়।

আজকের দিনে যাঁরা রানাঘাট-গেদে লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন যাতায়াত করেন, তাঁরা হয়তো খেয়ালই করেন না এর প্রতিটি স্টেশনের গুরুত্ব। রানাঘাট জংশন থেকে শুরু করে আড়ংঘাটা, বগুলা হয়ে শেষ স্টেশন গেদে পর্যন্ত মোট ১৩টি স্টেশন রয়েছে, যার মধ্যে ৮টিই হলো হল্ট। এই স্টেশনগুলো সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান ভরসা।

দুই দেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই লাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সালে এই সীমান্ত দিয়েই চালু হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আপাতত নিরাপত্তার স্বার্থে এই আন্তর্জাতিক ট্রেন পরিষেবা বন্ধ রয়েছে।

একটি সামান্য ৩২.৫ কিলোমিটারের রেললাইন, অথচ সাক্ষী ব্রিটিশ শাসন, দেশভাগের বেদনা আর দুই দেশের ইতিহাসের নানা ঘটনার।