১০.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি পেলে ভারতে বিমান উৎপাদন বাড়াবে লকহিড
কলকাতা: ভারতের ১০.৫ বিলিয়ন ডলারের মিডিয়াম ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট বা এমটিএ চুক্তি পেলে দেশে বিমান তৈরির পরিকাঠামো আরও বড় করার পরিকল্পনা করছে মার্কিন বিমান নির্মাতা সংস্থা…
কলকাতা: ভারতের ১০.৫ বিলিয়ন ডলারের মিডিয়াম ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট বা এমটিএ চুক্তি পেলে দেশে বিমান তৈরির পরিকাঠামো আরও বড় করার পরিকল্পনা করছে মার্কিন বিমান নির্মাতা সংস্থা লকহিড মার্টিন (Lockheed Martin)। টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস লিমিটেডের সঙ্গে ইতিমধ্যেই ভারতে যে উৎপাদন অংশীদারিত্ব রয়েছে, তার উপর ভিত্তি করেই এই সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
লকহিড মার্টিন বর্তমানে টাটার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতে সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিসের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে বিমানের এমপেনেজ বা টেল অ্যাসেম্বলি। নতুন এমটিএ প্রকল্পের জন্য এই বিদ্যমান উৎপাদন ক্ষমতাকেই আরও সম্প্রসারণ করতে চাইছে মার্কিন সংস্থাটি।
টাটার সঙ্গে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা
লকহিড মার্টিনের গ্লোবাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড্যান টেনি পিটিআইকে জানিয়েছেন, টাটার সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সি-১৩০জে বিমানের বিভিন্ন কম্পোনেন্ট এবং এমপেনেজ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং ভারতের নতুন এমটিএ প্রতিযোগিতায় এই উৎপাদন পরিকাঠামো আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। লকহিড মার্টিন ভারতে শুধু যন্ত্রাংশ তৈরির পরিমাণ বাড়াতে নয়, আরও বেশি উৎপাদনমূলক কাজ দেশেই করার সুযোগ খুঁজছে। ফলে চুক্তি পেলে ভারতের বিমান উৎপাদন শিল্পে মার্কিন সংস্থাটির উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে।
হায়দরাবাদে তৈরি হচ্ছে সি-১৩০জে-র টেল অ্যাসেম্বলি
বর্তমানে হায়দরাবাদে টাটা লকহিড মার্টিন অ্যারোস্ট্রাকচারসের কারখানায় সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিসের এমপেনেজ বা টেল অ্যাসেম্বলি তৈরি করা হয়। এই যন্ত্রাংশ পরে লকহিড মার্টিনের আন্তর্জাতিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়। টেল অ্যাসেম্বলির মধ্যে বিমানের অনুভূমিক ও উল্লম্ব স্ট্যাবিলাইজার, লিডিং এজ এবং টিপ অ্যাসেম্বলির মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। নতুন এমটিএ প্রকল্পে সাফল্য এলে এই উৎপাদন ব্যবস্থা আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন লকহিড মার্টিনের আধিকারিক।
৬০টি মিডিয়াম ট্রান্সপোর্ট বিমান কিনবে ভারত
ভারতীয় বায়ুসেনার পরিবহণ বিমানবহর আধুনিকীকরণের জন্য ৬০টি মিডিয়াম ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট কেনার টেন্ডার জারি হয়েছে। আগস্টে প্রকাশিত টেন্ডার অনুযায়ী প্রকল্পটির আনুমানিক মূল্য ১০.৫ বিলিয়ন ডলার। ভারতের পুরনো পরিবহণ বিমান, বিশেষ করে আন-৩২-এর জায়গা পূরণ করাও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। নতুন বিমানগুলি ১৮ থেকে ৩০ টন পেলোড বহন করতে সক্ষম হতে হবে। এছাড়াও উচ্চ উচ্চতার এলাকা এবং পুরোপুরি প্রস্তুত নয় এমন রানওয়ে বা সেমি-প্রিপেয়ার্ড এয়ারফিল্ড থেকেও বিমান পরিচালনা করতে পারা এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে।
১২টি বিমান বিদেশ থেকে, ৪৮টি ভারতে তৈরি
এমটিএ প্রকল্পে মোট ৬০টি বিমানের মধ্যে ১২টি বিমান ফ্লাইঅ্যাওয়ে অবস্থায় সরাসরি সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি ৪৮টি বিমান ভারতে তৈরি করতে হবে। এই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উপাদানই আন্তর্জাতিক বিমান নির্মাতাদের জন্য প্রতিযোগিতাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিদেশি সংস্থাকে ভারতীয় অংশীদারের সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এই চুক্তির জন্য পাঁচটি ভারতীয় সংস্থা প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এগুলি হল টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস লিমিটেড, মাহিন্দ্রা গ্রুপ, আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস, হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড বা এইচএএল এবং রিলায়েন্স ডিফেন্স। প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক বিমান নির্মাতাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করার পথে এগোচ্ছে।
লকহিড মার্টিন বনাম এমব্রায়ের
ভারতের এমটিএ প্রতিযোগিতায় বর্তমানে দুটি প্রধান বিমান রয়েছে। লকহিড মার্টিন প্রস্তাব করছে সি-১৩০জে-৩০ সুপার হারকিউলিস। অন্যদিকে ব্রাজিলের এমব্রায়ের প্রস্তাব করছে সি-৩৯০ মিলেনিয়াম। সি-১৩০জে-৩০ সুপার হারকিউলিসের পেলোড ক্ষমতা কনফিগারেশন অনুযায়ী প্রায় ১৯ থেকে ২২ টন। অন্যদিকে সি-৩৯০ মিলেনিয়াম সর্বোচ্চ ২৬ টন পর্যন্ত পেলোড বহন করতে পারে। দুই বিমানই সামরিক পরিবহণের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অপারেশনাল প্রয়োজন মেটানোর জন্য তৈরি। ফলে ভারতীয় বায়ুসেনার প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী কোন বিমান বেশি উপযুক্ত, তা মূল্যায়ন করা হবে।
এয়ারবাসের এ৪০০এম প্রতিযোগিতার বাইরে
ভারতের এমটিএ প্রয়োজনের জন্য এর আগে এয়ারবাসও তাদের এ৪০০এম অ্যাটলাস বিমান নিয়ে সাড়া দিয়েছিল। এটি সি-১৩০জে বা সি-৩৯০-এর তুলনায় বড় বিমান এবং প্রায় ৩৭ টন পর্যন্ত পেলোড বহন করতে পারে। তবে বর্তমান প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এয়ারবাস এখন মূল প্রতিযোগী হিসেবে এমটিএ প্রোগ্রামে এগোচ্ছে না।
ফলে লকহিড মার্টিন এবং এমব্রায়ের প্রস্তাবিত বিমানকে ঘিরেই বর্তমানে প্রতিযোগিতাটি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। চুক্তি পেলে শুধু ভারতীয় বায়ুসেনার পরিবহণ সক্ষমতা বাড়বে না, দেশের মাটিতে সামরিক বিমান উৎপাদনের পরিকাঠামোও আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।