ফ্লাইদুবাই হামলায় চাঞ্চল্যকর তথ্য, আগেই ক্রুদের তথ্য পেয়েছিল ইজরায়েল
নয়াদিল্লি: ফ্লাইদুবাইয়ের (Flydubai) দুবাই থেকে তেল আভিভগামী বিমানে ককপিটে হামলার ঘটনায় ইজরায়েলের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE) ওই বিমানের যাত্রী ও ক্রুদের তথ্য, তাঁদের জাতীয়তা-সহ, ইজরায়েলের সঙ্গে আগেই ভাগ করে নিয়েছিল। কিন্তু ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ যাত্রী বা ক্রুদের কারও বিষয়ে কোনও সতর্কতা বা রেড ফ্ল্যাগ জারি করেনি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইট FZ1073-এ ককপিটের ভিতরে ওমানি সহ-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে হামলা করেন বলে অভিযোগ। বিমানটিতে ১৮২ জন ছিলেন। তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে যায়। শেষ পর্যন্ত আহত ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন এবং যাত্রী ও অন্য ক্রু সদস্যরা হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে।
UAE তথ্য দেওয়ার পরও কেন সতর্কতা জারি হয়নি?
এপি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, UAE ইজরায়েলকে বিমানের যাত্রী ও ক্রুদের সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিল। সেই তালিকায় জাতীয়তার তথ্যও ছিল। কিন্তু ওই তালিকা পাওয়ার পর ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ কোনও যাত্রী বা ক্রু সদস্যকে নিয়ে সতর্কতা জারি করেছিল বলে জানা যায়নি।
তবে পরে ইজরায়েলের পরিবহণ মন্ত্রক জানিয়েছে, FZ1073-এর ক্রু তালিকা তাদের কাছে পৌঁছয়নি এবং মন্ত্রকের নিরাপত্তা বিভাগ ফ্লাইটের তালিকায় সরাসরি অ্যাক্সেসও পায় না। একইসঙ্গে মন্ত্রকের দাবি, ফ্লাইদুবাই তাদের জানিয়েছিল যে প্রয়োজনীয় ক্রু যাচাই করা হয়েছে এবং ইজরায়েলগামী বিমানে ক্রু সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে।
অর্থাৎ UAE যে তথ্য ইজরায়েলের কাছে পাঠিয়েছিল, সেটি কোন সংস্থার কাছে পৌঁছেছিল এবং পরিবহণ মন্ত্রকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তা ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম প্রশ্ন।
ALSO READ – শিল্প টানতে বড় উদ্যোগ বাংলার! এক জানালায় মিলবে সব ছাড়পত্র
নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব কার?
ঘটনার পর ইজরায়েলে নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে মতবিরোধ সামনে এসেছে। ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের বক্তব্য, বিদেশি বিমান সংস্থার যাত্রী তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্ব পরিবহণ মন্ত্রকের। অন্যদিকে পরিবহণমন্ত্রী মিরি রেগেভ বলেছেন, বিমান নিরাপত্তার দায়িত্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলির এবং তাঁর মন্ত্রককে ওই বিমানের যাত্রী তালিকা বা সহ-পাইলট সম্পর্কে কোনও সতর্কতা দেওয়া হয়নি।
টাইমস অব ইজরায়েল জানিয়েছে, আর্মি রেডিও এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অভ্যন্তরীণ নথির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিদেশি বিমান সংস্থাগুলির নিরাপত্তা যাচাই নিয়ে ইজরায়েলের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
২০২১ সালেই বদলেছিল দায়িত্ব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ইজরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বিদেশি বিমান সংস্থার নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব শিন বেতের কাছ থেকে সরিয়ে পরিবহণ মন্ত্রকের অধীন সিভিল এভিয়েশন অথরিটির হাতে দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের একটি গোপনীয় স্টেট কম্পট্রোলার রিপোর্টে পরিবহণ মন্ত্রক তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বলে ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে এই ব্যবস্থার পর্যালোচনার জন্য পরিবহণ মন্ত্রক, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, শিন বেত, মোসাদ এবং অর্থ মন্ত্রককে নিয়ে একটি দল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবহণ মন্ত্রক অবশ্য এই অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, বিদেশি বিমানের নিরাপত্তার দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরেই মন্ত্রকের অধীনে ছিল এবং তাদের পদ্ধতি ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা অনুমোদন করেছিল।
ALSO READ – স্কুল পাঠক্রমে বড় বদল! সিলেবাস থেকে বাদ পড়বে মোঘল শাসন থেকে সিঙ্গুর আন্দোলন
ওমানেই আগে উড়ান থেকে সরানো হয়েছিল সহ-পাইলটকে?
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল অভিযুক্ত সহ-পাইলট হামাম আল-হাম্মামির পূর্ববর্তী রেকর্ড। এপি-র উদ্ধৃত দুই সূত্রের দাবি, ওমানের কর্তৃপক্ষ আগে তাকে বিমান চালানোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। কারণ হিসেবে তার মধ্যে উগ্রপন্থী চিন্তাধারা সম্পর্কে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। পরে তাকে ওমান এয়ারে প্রশাসনিক দায়িত্বে পাঠানো হয়। এরপর তিনি UAE-ভিত্তিক ফ্লাইদুবাইয়ে চাকরি পান।
একজন উপসাগরীয় কূটনীতিকের দাবি, ফ্লাইদুবাইয়ে নিয়োগের আগে সাধারণ নিরাপত্তা যাচাই হয়েছিল। কিন্তু সেই যাচাই মূলত অপরাধমূলক রেকর্ডের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে ছিল, সম্ভাব্য উগ্রপন্থী প্রবণতা খতিয়ে দেখার মতো বিস্তৃত যাচাই সেখানে ছিল না বলে সূত্রটির দাবি।
তবে তদন্তকারীরা এখনও হামাম আল-হাম্মামির সঙ্গে কোনও জঙ্গি সংগঠনের সরাসরি যোগসূত্র পেয়েছেন বলে জানা যায়নি। চারটি আঞ্চলিক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমী দেশের সহায়তায় তার উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখছে।

ওমানি পাইলট কীভাবে ইজরায়েলগামী বিমানে?
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, ইজরায়েলের সঙ্গে ওমানের কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন ওমানি নাগরিক ইজরায়েলগামী বিমানের ককপিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলির চুক্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এমন দেশের নাগরিকদের পাইলট হিসেবে ইজরায়েলে উড়ে আসার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকার কথা বলা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর এই নিয়ম কীভাবে কার্যকর হয়েছিল, তা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে।
টাইমস অব ইজরায়েলের একটি পৃথক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এর আগেও ওমান-সহ কূটনৈতিক সম্পর্কহীন দেশের একাধিক পাইলট ইজরায়েলে উড়ে এসেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ কার্যকর করার ক্ষেত্রে ফাঁক ছিল।
তদন্তে এখন মূল নজর নিরাপত্তা ব্যবস্থায়
FZ1073-এর ঘটনা এখন শুধু বিমানের ভিতরে হামলার তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। UAE, ইজরায়েল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে, অভিযুক্ত সহ-পাইলটের পূর্ববর্তী রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমানের ককপিটে পৌঁছলেন।
বিশেষ করে UAE-এর দেওয়া যাত্রী-ক্রু সংক্রান্ত তথ্য ইজরায়েলের কোন সংস্থার কাছে পৌঁছেছিল, তা পরিবহণ মন্ত্রকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং বিদেশি পাইলটদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের দায়িত্ব বাস্তবে কে পালন করছিল, এই প্রশ্নগুলির উত্তরই তদন্তের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।