বাংলাসহ চার রাজ্যে চার রূপে দুর্গাপুজো, বদলায় রীতি-সংস্কৃতি-খাবারের স্বাদ
কলকাতা: দুর্গাপুজো (Durga Puja) মানেই বাঙালির আবেগ, উৎসব, সংস্কৃতি আর মিলন। তবে দেবী দুর্গার আরাধনা শুধু পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অসম, ওড়িশা এবং ত্রিপুরাতেও দীর্ঘদিন ধরে নানা রীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে দুর্গাপুজো পালিত হয়ে আসছে।
ষষ্ঠী থেকে দশমী, পাঁচ দিনের এই উৎসবকে ঘিরে কোথাও রাজপরিবারের পুরনো ঐতিহ্য, কোথাও জমিদারবাড়ির পুজো, আবার কোথাও সর্বজনীন উৎসবের ইতিহাস রয়েছে। একই দেবীর আরাধনা হলেও রাজ্য বদলানোর সঙ্গে বদলে যায় পুজোর রীতি, পোশাক, খাবার এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, অসমে দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য প্রায় ১৮৫০ সাল থেকে, পশ্চিমবঙ্গে বিষ্ণুপুরে প্রায় ৯৯৭ সাল থেকে, ওড়িশায় একাদশ শতক থেকে এবং ত্রিপুরায় প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছে।
অসমে রাজকীয় পুজো থেকে জমিদারবাড়ির ঐতিহ্য
অসমে দুর্গাপুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আহোম রাজাদের নাম। আহোম রাজা রুদ্র সিংহ গড়গাঁওয়ে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপুজোর প্রচলন করেছিলেন বলে মনে করা হয়।
পরবর্তীতে রাজধানী পরিবর্তনের সঙ্গে পুজোর স্থানও বদলে যায়। গড়গাঁও থেকে রংপুর এবং পরে জোরহাটের বুড়ি গোসানি দেৱালয়ে এই ঐতিহ্য পৌঁছয়। রুদ্র সিংহের সময় থেকেই নিয়ম মেনে পুজো এবং প্রতিমা আরাধনার প্রচলন হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিমা আনা হয়েছিল মেঘালয়ের জয়ন্তিয়া পাহাড় এলাকা থেকে।
অসমের ধুবড়ি জেলার গৌরীপুরের জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোও অত্যন্ত পুরনো। সেখানে ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুজো হয়ে আসছে। প্রথমে রাঙামাটিতে এই পুজো শুরু হলেও ১৮৫০ সালে রাজা প্রতাপচন্দ্র বড়ুয়া তা গৌরীপুরে নিয়ে আসেন।
শিবসাগরের দেবী দৌলও অসমের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। মহাষ্টমীর প্রসাদ প্রথমে নির্দিষ্ট মুসলিম এবং স্থানীয় পরিবারগুলির মধ্যে বিতরণের ঐতিহ্য ছিল বলে জানা যায়। এই রীতি দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতির একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ALSO READ – মহালয়ায় ইডেনের আকাশে ৩ হাজার ড্রোন, মহিষাসুরমর্দিনীর আবহে দুর্গাবরণ
পশ্চিমবঙ্গে বিষ্ণুপুর থেকে সর্বজনীন পুজো
দুর্গাপুজোর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী মন্দিরকে বাংলায় দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী, মল্লরাজা জগৎ মল্লের সময়ে প্রায় ৯৯৭ সালে সেখানে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল।
পরবর্তীতে বাংলার বিভিন্ন রাজপরিবার, জমিদার এবং অভিজাত পরিবারের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু হয়। কলকাতার আশপাশে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো ১৬১০ সালে শুরু হয়েছিল বলে একটি ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে দুর্গাপুজো রাজবাড়ি এবং জমিদারবাড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। অষ্টাদশ শতক থেকে বারোয়ারি এবং পরবর্তীতে সর্বজনীন দুর্গাপুজোর সংস্কৃতি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। আজকের কলকাতার দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল থিমের প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা, শিল্পকর্ম এবং প্রতিমার বৈচিত্র্য।
ALSO READ – বাংলাদেশি পাটপণ্যে শুল্ক বাড়াল মোদী সরকার! সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার প্রতি টনে
ওড়িশায় গোসানি পুজোর প্রাচীন ঐতিহ্য
ওড়িশায় দুর্গাপুজোর ইতিহাসও বহু প্রাচীন। পুরীর গোসানি যাত্রা এখনও সেই পুরনো ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওড়িশায় মাটির তৈরি দেবী দুর্গার প্রতিমা পুজোর প্রচলন গঙ্গ রাজবংশের রাজা চোড়গঙ্গ দেবের আমলে, একাদশ শতকে পুরীতে শুরু হয়েছিল বলে ঐতিহ্যগতভাবে মনে করা হয়। কটকের কাজিবাজার এলাকায় ১৮৩২ সালের একটি দুর্গাপুজোর উল্লেখও পাওয়া যায়। এছাড়া ষোড়শ শতকের গোড়ায় চৈতন্য মহাপ্রভুর কটক সফরের সঙ্গে বালুবাজার এলাকায় দুর্গাপুজোর প্রচলনের একটি যোগসূত্রের কথাও বলা হয়। ওড়িশার দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ হল রুপোর ফিলিগ্রি বা সূক্ষ্ম রুপোর কাজ দিয়ে তৈরি প্যান্ডেল এবং সাজসজ্জা।
ত্রিপুরায় রাজপরিবারের ৫০০ বছরের ঐতিহ্য
ত্রিপুরার আগরতলার দুর্গাবাড়ি মন্দিরের দুর্গাপুজোও পাঁচ শতাব্দীর পুরনো বলে পরিচিত। রাজপরিবারের উদ্যোগে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। বর্তমানেও এই পুজোর সঙ্গে ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য এখনও বিশেষ মর্যাদা নিয়ে পালিত হয়। দুর্গাবাড়িতে দুর্গাপুজোর আরও একটি পর্যায়ের সূচনা রাজা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য বাহাদুরের সময়ে, উনিশ শতকের গোড়ায় হয়েছিল বলে জানা যায়।
চার রাজ্যে বদলে যায় পুজোর পোশাক
দুর্গাপুজোর সঙ্গে পোশাকেরও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তবে রাজ্যভেদে সেই পোশাকে দেখা যায় আলাদা সংস্কৃতির ছাপ। অসমে মহিলাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক মেখেলা চাদর। পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোর সময় সাদা-লাল পাড়ের শাড়ি বিশেষ জনপ্রিয়। ওড়িশায় সাম্বলপুরি শাড়ি এবং ত্রিপুরায় রিগনাই পোশাকের ঐতিহ্য রয়েছে। তবে নতুন প্রজন্ম এবং শিশুদের মধ্যে আধুনিক পোশাকও সমান জনপ্রিয়।
খাবারেও রয়েছে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
দুর্গাপুজোর ভোগ এবং উৎসবের খাবারেও চার রাজ্যের নিজস্ব স্বাদ রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ: খিচুড়ি, লাবড়া, ভোগ এবং বিভিন্ন মাছের পদ।
অসম: পিঠা, খিচড়ি এবং দই-চিড়া।
ওড়িশা: ডালমা, ছেনা পোড়া এবং রসবলি।
ত্রিপুরা: বাঙালি ভোগের সঙ্গে স্থানীয় উপজাতীয় খাবারের মিশেল।
অর্থাৎ দেবীর আরাধনা একই হলেও পুজোর খাবারের তালিকায় স্থানীয় সংস্কৃতির স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়।
প্যান্ডেলেও আলাদা আলাদা শিল্পরীতি
পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলির একটি হল থিমের প্যান্ডেল। শিল্প, স্থাপত্য এবং সামাজিক বার্তাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর নতুন নতুন ভাবনা তুলে ধরা হয়।
অসমেও থিমভিত্তিক এবং সম্প্রদায়কেন্দ্রিক প্যান্ডেলের জনপ্রিয়তা রয়েছে। ওড়িশায় প্যান্ডেল সাজাতে রুপোর ফিলিগ্রি কাজ বিশেষ পরিচিত। ত্রিপুরার প্যান্ডেলে আবার লোকশিল্পের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির মিশেল দেখা যায়।
নাচ, গান ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো মানেই ঢাক, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পুজোর দিনগুলিতে শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে।
অসমে দুর্গাপুজোর পরিবেশে বিহু নাচ ও স্থানীয় সঙ্গীতের প্রভাব দেখা যায়। ওড়িশায় বিভিন্ন লোকশিল্পী ও সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনা উৎসবকে আরও সমৃদ্ধ করে। ত্রিপুরায় বাঙালি ঐতিহ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন জনজাতির নাচ ও সংস্কৃতিও পুজোর আবহে জায়গা করে নেয়।
আলাদা রীতি, কিন্তু আবেগ এক
চার রাজ্যে দুর্গাপুজোর আয়োজনের ধরন আলাদা হলেও মূল বিশ্বাস ও আবেগ একই। দেবীর প্রতিমা প্রতিষ্ঠা, পুজো, ভোগ নিবেদন এবং শেষে বিসর্জন, সব জায়গাতেই কোনও না কোনওভাবে এই রীতিগুলি পালন করা হয়।
বিসর্জনের সময় থাকে আগামী বছর আবার দেবীর আগমনের অপেক্ষা। এই বিশ্বাসই বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
দুর্গাপুজো তাই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি শিল্প, সংস্কৃতি, খাবার, পোশাক, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক মিলনেরও উৎসব। অসমের মেখেলা চাদর থেকে বাংলার লালপাড় শাড়ি, ওড়িশার সাম্বলপুরি থেকে ত্রিপুরার রিগনাই, কিংবা কলকাতার থিম প্যান্ডেল থেকে পুরীর গোসানি যাত্রা, প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য দুর্গাপুজোকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
একই দেবী, একই ভক্তি, কিন্তু চার রাজ্যে চার রকমের উদযাপন। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই ভারতের সংস্কৃতির অন্যতম বড় শক্তি লুকিয়ে রয়েছে।