স্লোগানে ‘কচোরি–সমোসা’, জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সুর চড়ল দিল্লিতে, উত্তাল মুম্বইও
এই সময়, নয়াদিল্লি: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ–সহ একাধিক নির্বাচনী সংস্কার ইস্যুতে ২ অক্টোবর, গান্ধী জয়ন্তীতে তারা পথে নামবে— এই হুঁশিয়ারি আগেই দিয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবং বাম–কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলো। দিল্লির যন্তর মন্তর এবং মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে জমায়েতের ডাক দেওয়া হলেও মেলেনি পুলিশি অনুমতি। উল্টে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মুড়ে ফেলা হয়েছিল দিল্লি ও মুম্বইয়ের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ চত্বরকে। শুক্রবার সেই নিরাপত্তা বলয় উপেক্ষা করেই পথে নামলেন হাজার হাজার প্রতিবাদী। ধাক্কাধাক্কি, লাঠিচার্জ, স্লোগানের ঝড়— শুক্রবার ধুন্ধুমার বিক্ষোভের সাক্ষী থাকল দেশ। আটক হলেন অন্তত ১,১০০ প্রতিবাদী!
শুক্রবার সকাল থেকেই লুটিয়েন্স দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত যন্তর মন্তরের ছবিটা গিয়েছিল বদলে। চারদিকে মোতায়েন সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ান৷ যন্তর মন্তরগামী সব ক’টা রাস্তায় দিল্লি পুলিশের ব্যারিকেড৷ আশেপাশে থাকা কেন্দ্রীয় সচিবালয় (সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট), খান মার্কেট, প্যাটেল চক, উদ্যোগ ভবন, জনপথ, লোককল্যাণ মার্গ, রাজীব চক— সব ক’টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ! মোবাইলের ইন্টারনেট বন্ধ অন্তত ১২ ঘণ্টা৷ তার মধ্যেই ‘হল্লা বোল, হল্লা বোল’ স্লোগান তুলে কেরালা ভবনের পাশ দিয়ে হাজার খানেকের একটা ভিড় যন্তর মন্তরে ঢুকে পড়ে সব বাধা টপকে৷ মুহূর্তেই রণক্ষেত্র পরিস্থিতি৷
প্রথমে দিল্লি পুলিশের প্রতিরোধ, তার পরে বিক্ষোভকারীদের কার্যত চ্যাংদোলা করে পুলিশের বাসে ভরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়৷ ২০ জুলাই ‘নিট’–প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে সিজেপি–র এমন আন্দোলনেরই সাক্ষী থেকেছিল দিল্লি। এ দিনের বিক্ষোভ থেকে আবার স্লোগান ওঠে, ‘এক কচোরি, দো সামোসা, জ্ঞানেশ তেরা নেহি ভরোসা’! বাম সমর্থিত ছাত্র সংগঠন আইসার প্রতিনিধিরা এই স্লোগান এবং জ্ঞানেশের নামাঙ্কিত পোস্টার হাতে ততক্ষণে যন্তর মন্তর চত্বর সরগরম করে তুলেছেন৷ আইসা–র সভাপতি নেহা বোরা ‘গণতন্ত্র বাঁচানো’র স্লোগান দিয়ে কমরেডদের প্রতিবাদে সামিল হওয়ার ডাক দিতে থাকেন। বিক্ষোভ দেখানোর সময়ে আপ নেতা ও দিল্লি সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী সৌরভ ভরদ্বাজকেও চ্যাংদোলা করে সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ৷ দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আতিশি মারলেনাও–কেও টানতে টানতে বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। আপ সাংসদ সঞ্জয় সিংয়ের সঙ্গে দিল্লি পুলিশের তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়৷ এক জন সাংসদ হিসেবে তাঁর পূর্ণ অধিকার আছে সংসদ ভবনে যাওয়ার, দিল্লি পুলিশ কোনও ভাবে তাঁকে বাধা দিতে পারে না— সঞ্জয় সিংয়ের এই যুক্তির সামনে কার্যত অসহায় দেখায় দিল্লি পুলিশ আধিকারিকদেরও৷ পুলিশকর্মীদের হাতজোড় করা অনুরোধে পিছু হটেন সঞ্জয়।
বিক্ষোভে সামিল সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, বর্ষীয়ান বামনেত্রী বৃন্দা কারাট এবং সৃজন ভট্টাচার্যকেও শুক্রবার যন্তর মন্তর থেকে জোর করে বাসে তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ৷ আটকদের তালিকায় আছেন মানবাধিকার কর্মী যোগেন্দ্র যাদব, বর্ষীয়ান আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, আরজেডি সাংসদ মনোজ ঝা–ও। বেলার দিকে যন্তর মন্তর সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে কংগ্রেস সমর্থিত ছাত্র সংগঠন এনএসইউআই৷ বিক্ষোভকারী ছাত্রদের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশ তাঁদের উপরে ব্যাপক বলপ্রয়োগ করেছে৷ বাসে তোলার পরে তাঁদের লাঠিপেটা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ৷ দিল্লি পুলিশের যদিও দাবি, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার(বিএনএস)-এর ১৬৩ ধারা (পূর্বতন সিআরপিসি–র ১৪৪ ধারা) জারি করে যন্তর মন্তর চত্বরে পাঁচ জন বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তার পরেও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল যে বিক্ষোভ দেখিয়েছে তা বেআইনি৷ অত্যধিক বলপ্রয়োগ না করেই বিক্ষোভকারীদের এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
মুম্বইয়ের ছবিটা অবশ্য একটু অন্যরকম ছিল। পুলিশি অনুমতি না–পেলেও মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে শুক্রবার বিকেল চারটের মধ্যে জড়ো হন অন্তত হাজার দশেক প্রতিবাদী। সেখানেই যোগ দিয়েছিলেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে–সহ ককরোচ পার্টির অন্য সদস্যরা। এ দিন মুম্বইয়ের প্রতিবাদ–জমায়েতে যোগ দেন বলিউডের নামজাদা ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন শাহ, বিশাল দাদলানি, শাবানা আজ়মি, মহাত্মা গান্ধীর বংশধর তুষার গান্ধীও। ‘সাইলেন্স জ়োন’ বলে দাবি করে শিবাজি পার্কে বিক্ষোভ–জমায়েতের অনুমতি দেয়নি মুম্বই পুলিশ, কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই পার্কে দাঁড়িয়েই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’–এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে বলতে শোনা গেল, ‘গান্ধীজি দেশের আত্মা আর আম্বেদকর মেরুদণ্ড। তাঁদের মতাদর্শ নিয়েই এই দেশ এগিয়ে যাবে। ওরা ভেবেছিল বুলেট দিয়ে গান্ধীজিকে মারবে। ওরা জানে না গডসেরা আসে–যায়, কিন্তু গান্ধীজিরা অমর। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কষ্টার্জিত টাকায় দামি পোশাক পরেন আর বিদেশ সফরে যান। এটা আর চলবে না! এই সরকার অকর্মণ্য বলেই দু’মাসের মধ্যে আমাদের ফের প্রতিবাদস্থলে ফিরতে হলো।’ মুম্বইয়ের শিবাজি পার্ক থেকে স্লোগান ওঠে, ‘জ্ঞানেশ ব্রো, এ বার পদত্যাগটা করেই ফেলো’, ‘গদ্দার জ্ঞানু পদ ছাড়ো’! প্রতিবাদে যোগ দেওয়া অভিনেত্রী শাবানা আজ়মিকে বলতে শোনা যায়, ‘নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলে সাধারণ মানুষ কী করবে? আমরা প্রতিবাদই করব, ওটা আমাদের অধিকার।’ শিবাজি পার্কের এই বিপুল সমাগমকে সাধারণ মানুষের ‘জয়’ বলেই উল্লেখ করেছেন শাবানা।
এ দিন শিবাজি পার্কে পুলিশের উপস্থিতি ছিল নজরে পড়ার মতো। অনুমতি ছাড়া সভার আয়োজন হলেও লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগের অভিযোগ মুম্বই পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠেনি। আর তাই দিল্লি পুলিশের বর্বরতার তুলনার মুম্বই পুলিশের ভূমিকার প্রশংসাই করেছেন দীপকে। তাঁর বক্তব্য, ‘মুম্বই পুলিশের উপরে অর্ডার ছিল আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার। মুম্বই পুলিশ অবশ্য আমাকে চা–অফার করে ভদ্রভাবে চলে যেতে বলে! ওরা দিল্লি পুলিশের মতো নয়! দিল্লি পুলিশের ডিসিপি সচিন শর্মা তো কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জেনারেল ডায়ার!’ তবে মুম্বইয়ের এই বিক্ষোভকে জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে দেশজোড়া বিক্ষোভের ‘ট্রেলার’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে সিজেপি। দীপকের কথায়, ‘এর পরে সারা দেশের লোক পথে নামবে, তাদের রোখার মতো ব্যারিকেড পুলিশ–প্রশাসনের কাছে নেই!’
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, শিবাজি পার্কের কাছেই সিজেপি–বিরোধী একটি জমায়েত এ দিন হয় ‘জেন নেক্সট মুম্বই’–এর ব্যানারে। সেই জমায়েত থেকে শোনা যায়, ‘অভিজিৎ দীপকের মতো লোক সংবিধানকে ধ্বংস করতে জানে। আমরাই পারি সংবিধানকে রক্ষা এবং সম্মান করতে।’ মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী আশিস শেলারও সিজেপি–র প্রতিবাদকে ‘নৈরাজ্য’ বলে তোপ দেগেছেন। জয়পুরেও এ দিন সার–বিরোধী প্রতিবাদে আপ কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতির খবর মিলেছে। লখনৌয়ে সমাজবাদী পার্টির বিক্ষোভেও চলেছে পুলিশি ধরপাকড়।