সুরে সুরে দুর্গা বন্দনা, পুজোর প্রস্তুতিতে রাত জাগছেন পিংলার পটুয়ারা - 24 Ghanta Bangla News
Home

সুরে সুরে দুর্গা বন্দনা, পুজোর প্রস্তুতিতে রাত জাগছেন পিংলার পটুয়ারা

Spread the love

Patachitra is a traditional cloth-based scroll and panel painting art

দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে পটুয়াদের ব্যস্ততা। ‘দুর্গে দুর্গে তারা গো মা, দুঃখ বিলাসিনী…’—এই চেনা বন্দনা গীতিতে এখন মুখরিত পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা ব্লকের নয়া গ্রামের পটুয়াপাড়া। তুলির রঙিন টানে দেবীর রূপ ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি চলছে সুরের নিখুঁত মহড়া। দুর্গাপুজোর মরশুমে মণ্ডপসজ্জার বরাত মেলার পাশাপাশি পটের গান পরিবেশনের ডাক আসায় এখন দম ফেলার ফুরসত নেই শিল্পীদের।

Patachitra making at pingla

নয়া গ্রামে বর্তমানে অন্তত ১৩৬টি পরিবারের বাস। সব মিলিয়ে ৩১০ থেকে ৩১৫ জন শিল্পী পটশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই লোকশিল্পই তাঁদের রুটিরুজি এবং পরিচিতি। পটচিত্রে প্রতিটি দৃশ্যের বর্ণনা গানের সুরে তুলে ধরাই এই পটের গানের বিশেষত্ব। একসময় যা কেবল গ্রাম বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছে গিয়েছে।

Patachitra making at pingla

পট তৈরির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার। বিভিন্ন ফুলের পাপড়ি, গাছের পাতা, পোড়া কাঠ, মাটি, খড়ি এবং প্রদীপের ভুসো কালি দিয়ে শিল্পীরা রঙ তৈরি করেন। সেই প্রাকৃতিক রঙেই কাপড়ের পটে আঁকা হয় দেবদেবী, পৌরাণিক উপাখ্যান এবং গ্রামীণ জীবনের ছবি।

Patachitra making at pingla

গ্রামের প্রবীণ পটশিল্পী বাহাদুর চিত্রকর জানিয়েছেন, দুর্গাপুজো সামনে থাকায় শিল্পীদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। চলতি বছর পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ লাইনের পুজোয় গান গাওয়ার জন্য বায়না এসেছে তাঁদের কাছে। এ ছাড়াও মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মেদিনীপুরের একাধিক জায়গায় মণ্ডপসজ্জার বরাত মিলেছে। এমনকী, ভিন রাজ্য বিহার থেকেও মণ্ডপ সাজানোর জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে নয়া গ্রামের শিল্লীদের সঙ্গে।

Patachitra making with natural color at pingla

পটশিল্পের ঐতিহ্যের মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক সম্প্রীতি। নয়া গ্রামের অধিকাংশ পটুয়াই মুসলিম। অথচ যুগ যুগ ধরে তাঁরাই দুর্গাবন্দনা, গণেশবন্দনা, চণ্ডীমঙ্গল কিংবা মনসামঙ্গলের কাহিনি নিয়ে ছবি আঁকেন ও গান বাঁধেন। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে তাঁদের এই শিল্পের চর্চা বাংলার সামাজিক ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন।

Patachitra making at pingla

ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক সচেতনতার বার্তাও খুব সহজে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এই শিল্পীরা। গাছ লাগানো, ডেঙ্গি প্রতিরোধ, সাক্ষরতা অভিযান কিংবা এইচআইভি নিয়ে পটের গান বেঁধেছেন তাঁরা। সরকারের নানা জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেও পটুয়ারা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন।

Patachitra making at pingla

শুধু মণ্ডপ বা কাগজের পট নয়, আধুনিক ফ্যাশনের দুনিয়াতেও এখন পিংলার পটচিত্রের দারুণ চাহিদা রয়েছে। শাড়ি, কুর্তি, টি-শার্ট, দোপাট্টা কিংবা পাঞ্জাবিতে সুক্ষ্ম তুলির কাজে পট ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীরা। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ এই পোশাক কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে অনলাইনে কেনাবেচাও শুরু করেছেন পটুয়ারা।

Patachitra making at pingla

শিল্পী বাহারজান চিত্রকর জানিয়েছেন, অসুর বধের পৌরাণিক বিশ্বাস এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে বয়ে নিয়েই তাঁরা এই কাজ করছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, এই পেশায় পরিশ্রম অনেক হলেও মানুষের ভালোবাসা মেলে।

Patachitra making at pingla

পুজোর আর হাতে গোনা কয়েকটা দিন বাকি। একদিকে মনোযোগে পটে রঙের প্রলেপ দেওয়া, অন্যদিকে হারমোনিয়ামে আঙুল ছুঁইয়ে গানের সুর তোলা—সব মিলিয়ে পিংলার নয়া গ্রামের ঘরে ঘরে এখন ব্যস্ততার ছবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *