ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রস্তুতি, ইলন মাস্ককে নিয়ে আমেরিকার ‘প্রজেক্ট মেরিডিয়ান’
ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেমন হতে পারে এবং আগামী কয়েক দশকে সেই যুদ্ধ মোকাবিলার জন্য আমেরিকার সামরিক বাহিনীর কী ধরনের অস্ত্র ও প্রযুক্তি প্রয়োজন হবে, তা খতিয়ে দেখতে নতুন উদ্যোগ শুরু করল আমেরিকা। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা করেছেন ‘প্রজেক্ট মেরিডিয়ান’ নামে এই বিশেষ উদ্যোগের।
প্রকল্পটির নেতৃত্বে থাকবেন স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক, আন্দুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা পামার লাকি এবং প্রাক্তন মার্কিন হাউস স্পিকার নিউট গিংরিচ। পেন্টাগনের প্রযুক্তি প্রধান এমিল মাইকেল এই উদ্যোগের কাজ সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
হেগসেথ ভার্জিনিয়ার মেরিন কর্পস বেস কোয়ান্টিকোতে তাঁর দ্বিতীয় ‘স্টেট অব দ্য ফোর্স’ ভাষণের সময় প্রকল্পটির ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি নতুন কোনও নীতিগত নথি তৈরির প্রকল্প নয়। বরং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং কোন সামরিক সক্ষমতা আয়ত্ত করা প্রয়োজন, সেটিই চিহ্নিত করা হবে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র কেমন হবে?
প্রজেক্ট মেরিডিয়ানের মূল লক্ষ্য হল ভবিষ্যতের যুদ্ধের গতিপথ বিশ্লেষণ করা এবং আমেরিকার সামরিক বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার ঘাটতি চিহ্নিত করা। পেন্টাগনের নথি অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ডাইরেক্টেড এনার্জি অস্ত্র, রোবোটিক্স এবং বায়োটেকনোলজির দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতের যুদ্ধের চরিত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রযুক্তিগুলির মধ্যে কোনগুলি বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কী ধরনের অস্ত্র ও ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার এবং সেগুলি কীভাবে দ্রুত পরীক্ষা ও সামরিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করবে প্রকল্পটি।
শুধু পেন্টাগনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নয়
প্রজেক্ট মেরিডিয়ানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এর কাজ শুধু প্রচলিত সামরিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রযুক্তিবিদ, উদ্ভাবক, ব্যবসায়িক নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারক এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদেরও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
এর উদ্দেশ্য হল সামরিক বাহিনীর প্রচলিত গবেষণার পাশাপাশি বেসরকারি প্রযুক্তি খাতের দ্রুত উদ্ভাবনকেও ভবিষ্যৎ যুদ্ধের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা। হেগসেথের বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল দেশটির উদ্ভাবক, প্রযুক্তিবিদ এবং বড় পরিসরে চিন্তা করতে সক্ষম ব্যক্তিদের সমন্বয় করা। সেই দক্ষতাকে ভবিষ্যতের সংঘাতের জন্য ব্যবহার করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ইলন মাস্ক ও পামার লাকির ভূমিকা
প্রজেক্ট মেরিডিয়ানের নেতৃত্বে ইলন মাস্কের অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্পেসএক্সের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কাজের পাশাপাশি সংস্থাটির মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চুক্তিও রয়েছে। অন্যদিকে, পামার লাকির প্রতিষ্ঠিত আন্দুরিল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ করে। সংস্থাটি জ্যামার, ইন্টারসেপ্টর, রকেট মোটর এবং স্বয়ংক্রিয় বা রোবোটিক যুদ্ধব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ফলে প্রকল্পটিতে মহাকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা একসঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
২০৩০, ২০৫০ থেকে ২১০০-এর যুদ্ধ নিয়ে ভাবনা
পামার লাকি বলেছেন, প্রকল্পটি শুধু বর্তমানে চলা যুদ্ধ বিশ্লেষণ করবে না। ভবিষ্যতে কোন ধরনের যুদ্ধ আমেরিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, সেটিও বিবেচনা করা হবে। এই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার মধ্যে ২০৩০, ২০৫০ এমনকি ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিস্থিতি এবং সেগুলি মোকাবিলার জন্য এখন থেকেই কী তৈরি করা প্রয়োজন, তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে তিনি জানান।
এর অর্থ, প্রজেক্ট মেরিডিয়ানকে শুধু তাৎক্ষণিক অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং আগামী কয়েক দশকে যুদ্ধের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কোন দিকে যেতে পারে, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
১২০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট
প্রজেক্ট মেরিডিয়ানের কাজের জন্য সময়সীমাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত ফলাফল ও সুপারিশ ১২০ দিনের মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দফতরে জমা দেওয়ার কথা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত রিপোর্টের নির্ধারিত সময়সীমা ২৮ জানুয়ারি ২০২৭। একটি প্রকাশ্য রিপোর্টের পাশাপাশি শ্রেণিবদ্ধ বা গোপনীয় রিপোর্টও তৈরি করা হবে।
এআই থেকে ডাইরেক্টেড এনার্জি, বদলাবে যুদ্ধের ধরন?
প্রজেক্ট মেরিডিয়ানের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রযুক্তিগুলির মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই সামরিক ক্ষেত্রে দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। একইভাবে ডাইরেক্টেড এনার্জি অস্ত্র, রোবোটিক্স এবং উন্নত বায়োটেকনোলজিও ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
পেন্টাগন ইতিমধ্যেই ডাইরেক্টেড এনার্জি অস্ত্রের পরীক্ষায় জোর দিয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে হেগসেথ ও পেন্টাগনের প্রযুক্তি প্রধান এমিল মাইকেল নিউ মেক্সিকোতে লেজার ও মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রের পরীক্ষাও প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
প্রজেক্ট মেরিডিয়ানের মাধ্যমে এখন এই ধরনের প্রযুক্তিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, ভবিষ্যতের সামগ্রিক যুদ্ধব্যবস্থার অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হবে।
প্রজেক্ট মেরিডিয়ান আমেরিকার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির একটি নতুন উদ্যোগ। আগামী ১২০ দিনে এই প্রকল্প কোন কোন প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করে, তার উপরই নজর থাকবে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।