‘চাকার উপর লেজার’ চিনের নতুন অস্ত্র, তাইওয়ান সংঘাতে কেন গুরুত্বপূর্ণ? - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘চাকার উপর লেজার’ চিনের নতুন অস্ত্র, তাইওয়ান সংঘাতে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

Spread the love

ড্রোন এখন আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতে দেখা গিয়েছে, তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন দিয়েও ট্যাঙ্ক, কামান, সামরিক যান এবং সেনাদের উপর বড় চাপ তৈরি করা সম্ভব। এই পরিস্থিতিতে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএও ড্রোন প্রতিরোধের জন্য নতুন ধরনের প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

চিনের সামাজিক মাধ্যমে ২৯ আগস্ট প্রকাশিত কিছু যাচাই না-করা ছবিতে টাইপ ১৯ ৮x৮ যুদ্ধযানের একটি নতুন সংস্করণ দেখা গিয়েছে। গাড়িটিতে লেজার অস্ত্রের পাশাপাশি অতিরিক্ত সেন্সর বসানো হয়েছে বলে ছবিগুলি থেকে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি যদি সত্যিই একটি কার্যকর অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা হয়, তাহলে সম্ভাব্য তাইওয়ান অভিযানে চিনা উভচর বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে। তবে গাড়িটির কার্যকরী অবস্থান, পরীক্ষামূলক পর্যায় নাকি প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্য তৈরি হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

টাইপ ১৯-এর সঙ্গে উভচর বাহিনীর সম্পর্ক

টাইপ ১৯ পরিবারের সাঁজোয়া যুদ্ধযান ইতিমধ্যেই চিনের পিএলএ-র উভচর বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা জেনস ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, এই পরিবারের যান ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের ৭৩তম গ্রুপ আর্মিতে যুক্ত হয়েছে। এই কমান্ডের অধীনে এমন উভচর ব্রিগেড রয়েছে, যেগুলি সম্ভাব্য তাইওয়ান অভিযান হলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হয়।

নতুন গাড়িটিও যদি টাইপ ১৯-এর উভচর ক্ষমতা ধরে রাখে, তাহলে সেটি সৈন্য ও সাঁজোয়া যানবাহনের সঙ্গে জলপথ পেরিয়ে উপকূলে পৌঁছতে পারবে এবং একই সঙ্গে স্বল্প পাল্লার নজরদারি ড্রোন ও ঘোরাফেরা করে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে।

Advertisements


   


   

‘চাকার উপর লেজার’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই ধরনের ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, লেজার অস্ত্র দিয়ে ড্রোন মোকাবিলা করতে প্রতিটি লক্ষ্যের জন্য আলাদা প্রচলিত মিসাইল বহন করার প্রয়োজন হয় না। ফলে বড় সংখ্যায় সস্তা ড্রোন হামলা হলে প্রতিরোধের খরচ তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হতে পারে। প্রতিরক্ষা পরামর্শদাতা টিমোথি হিথের মতে, সম্ভাব্য তাইওয়ান সংঘাতে তাইওয়ানের বাহিনী যদি ড্রোনের ঝাঁক ব্যবহার করে চিনা উভচর যানগুলিকে লক্ষ্য করে, তাহলে লেজারভিত্তিক অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ একটি ব্যয়বহুল মিসাইল দিয়ে একটি তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ধ্বংস করার বদলে, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে লেজার ব্যবহার করে কম পরিচালন খরচে একাধিক ড্রোন মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।

তাইওয়ানও তৈরি করছে বড় ড্রোন বাহিনী

চিনের এই সম্ভাব্য নতুন অস্ত্রের গুরুত্ব আরও বাড়ছে কারণ তাইওয়ান নিজেও ড্রোন সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। ৩ সেপ্টেম্বর তাইওয়ানের মন্ত্রিসভা ১৪৫.৭ বিলিয়ন তাইওয়ানিজ ডলারের, প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব দেয়। এই প্যাকেজে ৬০০-র বেশি উপকূলীয় নজরদারি ও অনুসন্ধান ড্রোন এবং ৪০,০০০-এর বেশি উপকূলীয় আক্রমণাত্মক ড্রোন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই প্রস্তাব এখনও আইনসভার অনুমোদনের অপেক্ষায়। এর আগে তাইওয়ানের আইনপ্রণেতারা দেশীয়ভাবে তৈরি ড্রোনের জন্য ছয় বছরের ২৪০ বিলিয়ন তাইওয়ানিজ ডলারের কাঠামো অনুমোদন করেছিলেন।

তাইওয়ানের সেনাবাহিনীও ড্রোন যুদ্ধের দিকে নিজেদের কাঠামো বদলাচ্ছে। এপ্রিল মাসে তিনটি অপারেশনাল যুদ্ধাঞ্চলে ড্রোন ব্যাটালিয়ন গঠন সম্পন্ন হয়েছে। মেরিন কোরও এর আগে একটি ড্রোন ব্যাটালিয়ন তৈরি করেছে। আগস্টে অনুষ্ঠিত হান কুয়াং ৪২ সামরিক মহড়ায় তাইওয়ানের ড্রোন ইউনিটগুলি যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, অনুসন্ধান, গোয়েন্দা তথ্য পাঠানো এবং আক্রমণাত্মক মিশনে অংশ নেয়।

শুধু হামলা নয়, ড্রোনের আরও বড় বিপদ

উভচর বাহিনীর জন্য ড্রোনের হুমকি শুধু সরাসরি আক্রমণে সীমাবদ্ধ নয়। ড্রোন দিয়ে সেনাদের গতিবিধি নজরে রাখা, সামরিক যান শনাক্ত করা এবং অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব। সেই তথ্য ব্যবহার করে কামান, মিসাইল বা অন্য অস্ত্রকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা যেতে পারে। তাই উপকূলে অবতরণের সময় যখন একটি উভচর বাহিনী তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তখন তার সঙ্গে চলতে সক্ষম মোবাইল অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষা

টাইপ ১৯-এর এই সম্ভাব্য নতুন সংস্করণকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে। ওই যুদ্ধে ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়েছে নজরদারি, কামানের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামে হামলার জন্য। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হিথের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পিএলএ-ও একই ধরনের শিক্ষা নিয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এর আগে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের সংঘর্ষেও ড্রোন প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সক্ষমতা দেখিয়েছিল। ফলে সাঁজোয়া যানেই সেন্সর, বন্দুক, মিসাইল বা নির্দেশিত শক্তির অস্ত্র যুক্ত করে সরাসরি অ্যান্টি-ড্রোন সুরক্ষা দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

শুধু চিন নয়, অন্য দেশও একই পথে

মোবাইল লেজার অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা শুধু চিন করছে না। দক্ষিণ কোরিয়ার হানওয়া সম্প্রতি টাইগন ৮x৮ সাঁজোয়া যানের একটি সংস্করণ দেখিয়েছে, যাতে ৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার অ্যান্টি-ড্রোন লেজার রয়েছে। সংস্থাটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে এবং ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ধারাবাহিক উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে।

আমেরিকাতেও অ্যারোভায়রনমেন্টের ২০ কিলোওয়াট শ্রেণির লোকাস্ট ব্যবস্থা আর্মির জয়েন্ট লাইট ট্যাকটিক্যাল ভেহিকেলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির অধীনে এমন ব্যবস্থা মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য মোবাইল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা যুক্ত করার প্রবণতা আন্তর্জাতিকভাবেই বাড়ছে।

লেজারেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে

লেজারকে ভবিষ্যতের অ্যান্টি-ড্রোন অস্ত্র হিসেবে দেখা হলেও এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বৃষ্টি, ধুলো, ধোঁয়া ও খারাপ আবহাওয়া লেজারের কার্যকারিতা কমাতে পারে। এছাড়া শক্তিশালী লেজার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। উভচর অভিযানের সময় এই বিষয়গুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে যানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ বা পুনরায় সরবরাহের সুযোগ সীমিত থাকতে পারে।

এই কারণেই নতুন টাইপ ১৯ সংস্করণে লেজারের পাশাপাশি প্রচলিত কামানও রাখা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী লেজার ব্যবহার করা যেতে পারে, আবার লেজারের জন্য অনুকূল নয় এমন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে কামান ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

তাইওয়ান ঘিরে কেন এই অস্ত্রের গুরুত্ব বাড়ছে?

চিনের নতুন টাইপ ১৯ সংস্করণটি শেষ পর্যন্ত পিএলএ-র সক্রিয় বাহিনীতে যুক্ত হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি পরীক্ষামূলক যান, প্রযুক্তি প্রদর্শক নাকি ভবিষ্যতের নিয়মিত যুদ্ধযানের অংশ, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই।

তবে এর তাৎপর্য শুধু লেজার অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল পরিবর্তন হল, পিএলএ কীভাবে ক্রমশ ড্রোনকেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নিজেদের সাঁজোয়া বাহিনীকে প্রস্তুত করছে।

যদি এই ধরনের যান ভবিষ্যতে কার্যকরভাবে মোতায়েন করা হয়, তাহলে সম্ভাব্য তাইওয়ান অভিযানে উভচর বাহিনীর সঙ্গে চলতে থাকা একটি মোবাইল অ্যান্টি-ড্রোন ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এর বাস্তব সক্ষমতা, বিদ্যুতের প্রয়োজন, উভচর অবস্থায় কর্মক্ষমতা এবং সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির অবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯

আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ

আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *