বিগ ব্যাশে দল কিনতে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিদের আগ্রহ, তবু কেন পিছিয়ে যাচ্ছেন অনেকে?
মুম্বই: ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বা সিএ বিগ ব্যাশ লিগে (Big Bash League) বেসরকারি বিনিয়োগের দরজা খুলে দেওয়ার পর থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে। আইপিএলের একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি লিগের দলগুলিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। তবে আগ্রহ থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বিনিয়োগ নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমানে মেলবোর্ন রেনেগেডসই একমাত্র বিগ ব্যাশ ফ্র্যাঞ্চাইজি, যেটি ১০০ শতাংশ মালিকানা বিক্রির জন্য বাজারে রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দলটির টেন্ডার ও বিক্রির প্রক্রিয়া ক্রিকেট ভিক্টোরিয়ার পরিবর্তে সরাসরি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া পরিচালনা করছে। বিগ ব্যাশ একটি লাভজনক টি-টোয়েন্টি লিগ হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের কাছে এর আকর্ষণ যথেষ্ট। কিন্তু আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকদের কাছে অস্ট্রেলিয়ায় দল কেনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হচ্ছে।
নতুন করে ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে
ক্রিকবাজের রিপোর্ট অনুযায়ী, কোনও ভারতীয় বা অন্য দেশের ব্যবসায়িক গোষ্ঠী যদি মেলবোর্ন রেনেগেডসের সম্পূর্ণ মালিকানা কিনেও নেয়, তাদের কার্যত নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক পরিচয় এবং শক্তিশালী সমর্থকভিত্তি তৈরি করতে হবে।
অন্যান্য বেশ কিছু টি-টোয়েন্টি লিগে দলগুলির সঙ্গে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট ও বাণিজ্যিক কাঠামো রয়েছে। কিন্তু রেনেগেডসের ক্ষেত্রে নতুন মালিককে ব্র্যান্ডের ভবিষ্যৎ, বাণিজ্যিক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি সমর্থকভিত্তি তৈরিতে যথেষ্ট কাজ করতে হবে। এটাই আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
Advertisements
Read More: বুমরাহর সামনে নেটে সমস্যায় বৈভব, আফগানিস্তান সিরিজের আগে কঠিন পরীক্ষা
আইপিএল মালিকদের আগ্রহ আছে, কিন্তু খুব বেশি নয়
দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ক্যারিবিয়ান এবং আমেরিকার টি-টোয়েন্টি লিগে ইতিমধ্যেই আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকদের বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশও তাঁদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় বাজার।
রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু আইপিএল মালিক বিগ ব্যাশের ফ্র্যাঞ্চাইজিতে অংশীদারিত্ব কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে সেই আগ্রহ প্রত্যাশার তুলনায় খুব বেশি নয়। এর পিছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা।
নিয়ন্ত্রণ থাকবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হাতে
আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হল দলের পরিচালনায় যথেষ্ট স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বিগ ব্যাশে সেই নিয়ন্ত্রণ সীমিত হতে পারে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক সূচি, বেতনসীমা, কেন্দ্রীয় সম্প্রচার স্বত্ব এবং ক্রিকেটারদের প্রাপ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে। অর্থাৎ, কোনও বিনিয়োগকারী দলটির মালিকানা পেলেও লিগের মূল পরিচালন ব্যবস্থার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবেন না। আইপিএল মালিকদের ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে এই কাঠামোর পার্থক্য রয়েছে।
Read More: কবে থেকে শুরু হচ্ছে আইএসএল ? চূড়ান্ত হল দিনক্ষণ
অস্ট্রেলিয়ার তারকা ক্রিকেটারদের পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিগ ব্যাশের আরেকটি সমস্যা হল এর সময়সূচি। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের দ্য হান্ড্রেডের মতো আলাদা আন্তর্জাতিক-মুক্ত উইন্ডো নেই বিগ ব্যাশের। অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গ্রীষ্মকালীন সূচির সঙ্গেই বিগ ব্যাশ চলে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বড় তারকারা নিয়মিতভাবে পুরো টুর্নামেন্টে খেলবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি লিগে বিনিয়োগকারী ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলি সাধারণত বড় নামের ক্রিকেটারদের উপস্থিতিকে বাণিজ্যিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখে। বিগ ব্যাশে সেই নিশ্চয়তা কম থাকায় বিনিয়োগের আকর্ষণ কিছুটা কমতে পারে।
বেশি করও বড় সমস্যা
অস্ট্রেলিয়ার কর কাঠামোও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের চিন্তার কারণ। দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং বাংলাদেশের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী টি-টোয়েন্টি লিগের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় করের বোঝা বেশি।
আর এখানেই তৈরি হচ্ছে আরও একটি সমস্যা। ওই লিগগুলির ঘরোয়া ক্রিকেটের সময়সূচি অনেক ক্ষেত্রে বিগ ব্যাশের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়। ফলে বিদেশি ক্রিকেটাররা অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অন্য লিগের চুক্তিকে বেশি লাভজনক মনে করতে পারেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিগ ব্যাশের দলগুলির তারকা ক্রিকেটার সংগ্রহের ক্ষমতায়।
দীর্ঘ ভ্রমণও বড় চ্যালেঞ্জ
অস্ট্রেলিয়ার বিশাল ভৌগোলিক পরিসরও বিগ ব্যাশের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির জন্য সমস্যার কারণ। পূর্ব উপকূলের কোনও শহর থেকে পার্থে একটি ঘরোয়া ম্যাচ খেলতে যেতে হলে ক্রিকেটারদের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার দীর্ঘ বিমানযাত্রা করতে হয়। এর ফলে ক্রিকেটারদের ক্লান্তি এবং লজিস্টিক খরচ দুটোই বাড়ে।
তুলনায় দক্ষিণ আফ্রিকার বেশিরভাগ আয়োজক শহরের মধ্যে যাতায়াতের দূরত্ব অনেক কম। ইংল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বা ক্যারিবিয়ান লিগগুলিতেও ভ্রমণের চাপ তুলনামূলকভাবে কম।
সম্প্রচার চুক্তির মেয়াদও হিসাবের মধ্যে
বেসরকারি বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হলেও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে সাত বছরের একটি সম্প্রচার স্বত্ব চক্রের মধ্যে রয়েছে। সেই চুক্তির এখনও চার বছর বাকি।
ফলে নতুন কোনও মালিককে আগে থেকেই নির্ধারিত সম্প্রচার চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই নিজের বিনিয়োগ থেকে কতটা রিটার্ন পাওয়া সম্ভব, তা হিসাব করতে হবে। নতুন মালিকের হাতে সম্প্রচার চুক্তির শর্ত বদলে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ থাকবে না।
লাভজনক দল হওয়ায় আপত্তিও রয়েছে
বিগ ব্যাশের অধিকাংশ বিদ্যমান ফ্র্যাঞ্চাইজিই লাভের মধ্যে রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই কারণেই লিগের বেসরকারিকরণ নিয়ে অনেকের আপত্তি রয়েছে। অর্থাৎ, বিগ ব্যাশে বেসরকারি বিনিয়োগ নতুন মূলধন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দক্ষতা আনতে পারে ঠিকই, কিন্তু ইতিমধ্যেই লাভজনক একটি কাঠামোতে মালিকানা বদলের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সব মিলিয়ে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির কাছে বিগ ব্যাশ একটি আকর্ষণীয় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ হলেও, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণ, অস্ট্রেলীয় তারকাদের সীমিত প্রাপ্যতা, করের চাপ, দীর্ঘ ভ্রমণ এবং বর্তমান সম্প্রচার চুক্তি, সবকিছু হিসাব করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।