ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব ‘স্টারলিঙ্ক’ বানাচ্ছে পোল্যান্ড, ভারত কোথায়?
ইউক্রেন যুদ্ধ (Ukraine War) আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইট যোগাযোগের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নিজেদের সামরিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির পথে এগোচ্ছে পোল্যান্ড। ফিনল্যান্ডের মহাকাশ সংস্থা আইসিইওয়াইই এবং পোল্যান্ডের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা পিজেডজি-র সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি হতে চলেছে এমন একটি ব্যবস্থা, যাকে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সম্ভাব্য ‘পোলিশ স্টারলিঙ্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
৯ সেপ্টেম্বর কিলসেতে অনুষ্ঠিত এমএসপিও প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে এই প্রকল্প নিয়ে দুই সংস্থা একটি সমঝোতাপত্রে সই করেছে। পোল্যান্ডের পরিকল্পনা শুধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নয়, বরং এমন একটি দেশীয় পরিকাঠামো তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে সামরিক যোগাযোগের জন্য বিদেশি বেসরকারি সংস্থার উপর নির্ভরতা কমানো যায়।
কেন নিজস্ব স্টারলিঙ্ক চাইছে পোল্যান্ড?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে স্পেসএক্সের স্টারলিঙ্ক ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার স্টারলিঙ্ক টার্মিনালের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং কিছু ড্রোন পরিচালনার কাজ করেছে।
স্যাটেলাইট-ভিত্তিক এই যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রচলিত যোগাযোগ পরিকাঠামোর তুলনায় যুদ্ধক্ষেত্রে বেশ কিছু সুবিধা দিয়েছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর ক্ষেত্রে স্টারলিঙ্ক নজরদারি ও যোগাযোগে তুলনামূলকভাবে প্রতিরোধী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করেছে এবং শত্রুর পক্ষে সেটি সহজে জ্যাম বা গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে অচল করা কঠিন হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে একই সঙ্গে একটি বড় ঝুঁকিও সামনে এসেছে, আর তা হল একটি বেসরকারি পরিষেবা প্রদানকারীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
Advertisements
স্টারলিঙ্ক বিভ্রাটে থমকে গিয়েছিল ইউক্রেনের অভিযান
২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিশ্বজুড়ে স্টারলিঙ্ক পরিষেবায় একটি বড় বিভ্রাট হয়েছিল। এর প্রভাব ইউক্রেনীয় সামরিক যোগাযোগের উপরও পড়ে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরিষেবা ব্যাহত থাকায় ড্রোন অভিযান এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সমন্বয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানা যায়। একজন ইউক্রেনীয় ড্রোন কমান্ডারের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিষেবা বন্ধ থাকার সময় বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযান পিছিয়ে দিতে হয়েছিল। এই ঘটনা ইউরোপের দেশগুলির কাছে বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে স্টারলিঙ্কের কার্যকারিতা যেমন প্রমাণিত হয়েছে, তেমনই একটি মাত্র বেসরকারি ব্যবস্থার উপর নির্ভরতার দুর্বলতাও সামনে এসেছে।
কীভাবে তৈরি হবে ‘পোলিশ স্টারলিঙ্ক’?
নতুন প্রকল্পে প্রযুক্তিগত দায়িত্বে থাকবে ফিনল্যান্ডের আইসিইওয়াইই। সংস্থাটি স্যাটেলাইটের স্থাপত্য তৈরি, মহাকাশযান নির্মাণ এবং স্যাটেলাইট পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। অন্যদিকে পিজেডজি পোল্যান্ডের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় শিল্পভিত্তি তৈরি করবে। দেশীয় সংস্থাগুলিকে প্রকল্পে যুক্ত করা, উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও পরিকাঠামোর সমন্বয় করার দায়িত্ব থাকবে তাদের উপর। প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ডিফেন্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পিত ব্যবস্থায় একাধিক স্যাটেলাইট নিয়ে একটি ডিস্ট্রিবিউটেড স্যাটেলাইট আর্কিটেকচার থাকবে। এর সঙ্গে তৈরি হবে দেশীয় গ্রাউন্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং শিল্পভিত্তি। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পোল্যান্ড নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী এই ব্যবস্থা তৈরি, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে চাইছে।
টাস্কের বার্তা, আধুনিক যুদ্ধে যোগাযোগই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগকে তিনি “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” বলে উল্লেখ করেছেন।
আধুনিক যুদ্ধ শুধু ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়। সেনা ইউনিটের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদানপ্রদান, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ প্রয়োজন। এই জায়গাতেই স্যাটেলাইট যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পোল্যান্ড যখন নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির দিকে এগোচ্ছে, ভারত ইতিমধ্যেই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ সক্ষমতা ব্যবহার করছে।
ভারতীয় নৌবাহিনী প্রথম আলাদা সামরিক যোগাযোগ স্যাটেলাইট পেয়েছিল জিস্যাট-৭-এর মাধ্যমে। ২০১৩ সালে উৎক্ষেপিত এই স্যাটেলাইট নৌবাহিনীর জন্য একটি স্বতন্ত্র মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করে।
এরপর ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য জিস্যাট-৭এ উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৮ সালে। এটি ভারতীয় অঞ্চলে সামরিক ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ পরিষেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। ফলে ভারতের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই শুধু একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল নয়।
আরও শক্তিশালী স্তর যোগ হয়েছে সিএমএস-০৩-এ
ভারতীয় সামরিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও আধুনিক স্তর যোগ হয়েছে সিএমএস-০৩, যাকে জিস্যাট-৭আর নামেও চিহ্নিত করা হয়। ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর উৎক্ষেপণ করা এই স্যাটেলাইটটি বিশেষভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
সরকারের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি নৌবাহিনীর জন্য ভারতের সবচেয়ে উন্নত যোগাযোগ স্যাটেলাইট। এর লক্ষ্য হল মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ এবং সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নজরদারি বা মেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস আরও শক্তিশালী করা। প্রায় ৪,৪০০ কেজি ওজনের সিএমএস-০৩ ভারতীয় মাটি থেকে উৎক্ষেপিত সবচেয়ে ভারী যোগাযোগ স্যাটেলাইট। এর কভারেজ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত।
ভারত ও পোল্যান্ডের অবস্থানের পার্থক্য
পোল্যান্ডের বর্তমান উদ্যোগ মূলত ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং বিদেশি বেসরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজন থেকে তৈরি হচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। ভারত ইতিমধ্যেই জিস্যাট-৭, জিস্যাট-৭এ এবং পরবর্তী প্রজন্মের সিএমএস-০৩-এর মতো নিজস্ব সামরিক যোগাযোগ পরিকাঠামো তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ভারত মহাসাগরের বিশাল অঞ্চলে নৌবাহিনীর অভিযান পরিচালনার জন্য সিএমএস-০৩-এর মতো স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের লক্ষ্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সংযোগ বজায় রাখা নয়, বরং সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর জন্য সার্বভৌম মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক সংঘাতে যে পক্ষ দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ তথ্য আদানপ্রদান করতে পারে, তার কৌশলগত সুবিধা অনেক বেশি। পোল্যান্ড তাই এখন নিজস্ব ‘স্টারলিঙ্ক’ তৈরির পথে। আর ভারত ইতিমধ্যেই সেই পরিকাঠামোর একটি নিজস্ব সংস্করণ গড়ে তুলে তার পরবর্তী প্রজন্মকে আরও শক্তিশালী করছে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন