হাইকোর্টের ভর্ৎসনার মুখে জ্ঞানেশ কন্যা মেধা রূপম, বাঙালি কন্যাকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিদান - 24 Ghanta Bangla News
Home

হাইকোর্টের ভর্ৎসনার মুখে জ্ঞানেশ কন্যা মেধা রূপম, বাঙালি কন্যাকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিদান

Spread the love

শান্তিপূর্ণ শ্রমিক বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার অভিযোগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (NSA)-এ আটক করার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষুব্ধ এলাহাবাদ হাইকোর্ট। এই ঘটনায় দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা তথা নয়ডার জেলা শাসক মেধা রূপমকে তীব্র ভর্ৎসনা করল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। চলতি বছরে নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভের সময়ে বঙ্গতনয়া আকৃতি চৌধুরীকে NSA আইনে আটক করার নির্দেশ ছিল তাঁরই। আদালতের পর্যবেক্ষণ, প্রশাসনের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণ চলতে থাকলে উত্তরপ্রদেশ ধীরে ধীরে ‘Orwellian Dystopia’-এ অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলের চরম দমন-পীড়ন মূলক প্রশাসনে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিক স্বাধীনতা এবং তাঁর ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করা শুরু হবে। এই ঘটনায় মেধা রূপমকে নিজের বেতন থেকে আকৃতিকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সার্ভিস রেকর্ডেও লাগল দাগ।

গত ১২ এপ্রিল নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার অভিযোগে আটক করা হয় বাংলার কন্যা আকৃতি চৌধুরীকে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আকৃতি এর পরে টানা পাঁচ মাস বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন। গত ২ সেপ্টেম্বর আদালত ২৫ বছরের আকৃতি চৌধুরীর বিরুদ্ধে জারি হওয়া NSA-র ধারা প্রয়োগকে খারিজ করে দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। বিচারপতি অতুল শ্রীধরন ও বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, আকৃতিকে এতদিন আটকে রাখা তাঁর ‘জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার, অর্থাৎ সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে।’ আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের ভিত্তি হিসেবে দেওয়া তথ্যপ্রমাণ যথেষ্ট ছিল না বলে আদালত জানিয়েছে। সেখানেই জেলাশাসক জ্ঞানেশ কন্যা মেধার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এলাহাবাদ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ।

‘শুধু অভিযোগ আর অনুমানের ভিত্তিতে NSA নয়’

আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, NSA একটি ‘ব্যতিক্রমী আইন’। সাধারণ ফৌজদারি আইনের বিকল্প হিসেবে এই আইন ব্যবহার করা যায় না। আকৃতির বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলিকে আদালত ‘পুনরাবৃত্তিমূলক, অনুমাননির্ভর এবং শুধুমাত্র মতামতের উপর ভিত্তি করে তৈরি’ বলে মন্তব্য করেছে। শুধুমাত্র অনুমান, পক্ষপাত বা ধারণার ভিত্তিতে কাউকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না বলেও জানিয়েছে বেঞ্চ।

মেধা রূপমের ভূমিকার সমালোচনা করে আদালতের মন্তব্য, ‘নয়ডার জেলাশাসক আকৃতিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন’, যাতে অন্যরা শ্রমিকদের সমর্থনে প্রকাশ্যে কথা বলা বা প্রতিবাদ করার সাহস না পান। এই আচরণকে আদালত অত্যন্ত নিন্দনীয় ও গুরুতর বলে মনে করেছে।

‘আপনাদের আনুগত্য সংবিধানের প্রতি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নয়’

এখানেই শেষ নয়, প্রশাসনিক আধিকারিকদের দায়িত্ব নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে আদালত। বেঞ্চ জানিয়েছে, আমলা এবং পুলিশ আধিকারিকদের হাতে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয় নাগরিকদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার, মর্যাদা এবং কল্যাণ রক্ষা করার জন্য। এই প্রসঙ্গেই জ্ঞানেশ কন্যা আদালতের ভর্ৎসনার মুখে। এলাহাবাদ হাইকোর্টের মতে, মেধা আকৃতির মত প্রকাশের অধিকারে বাধা সৃষ্টি করে তাঁর সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন করেছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ‘উপহাসের যোগ্য’।

আদালতের কথায়, তাঁদের মনে রাখতে হবে— ‘তাঁদের আনুগত্য সংবিধানের প্রতি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নয়। গণতন্ত্রে সাধারণ মানুষই আসল ক্ষমতার মালিক, আর সরকারি আধিকারিকরা তাঁদের সেবক।’ এই দায়িত্ব ভুলে গিয়ে যদি আধিকারিকরা নাগরিকের অধিকার দমন করতে শুরু করেন, তাহলে তাঁদের আচরণকে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিপীড়নমূলক শাসন’-এর মতো মনে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছে আদালত।

৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, বেতন থেকেই কাটার নির্দেশ

আকৃতিকে অন্যায়ভাবে NSA-তে আটকে রাখার জন্য তাঁকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। শুধু রাজ্য সরকারকে টাকা দেওয়ার নির্দেশ নয়, এই অর্থ নয়ডাক DM মেধা রূপম এবং মামলার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য আধিকারিকদের বেতন থেকে, এমনকী সংশ্লিষ্ট SHO পর্যন্ত, আদায় করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে জেলাশাসক এবং NSA-র নথি তৈরিতে যুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আদালতের ‘অসন্তোষ’ তাঁদের সার্ভিস রেকর্ডে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কী অভিযোগ ছিল আকৃতির বিরুদ্ধে?

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে নয়ডায় শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি এবং মানবিক কাজের সময়ের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছিল। সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্রী এবং অ্যাক্টিভিস্ট আকৃতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে NSA প্রয়োগ করে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। অভিযোগ ছিল, তিনি বিক্ষোভকারীদের হিংসা, পাথর ছোড়া এবং অগ্নিসংযোগে উস্কানি দিয়েছিলেন। কিন্তু হাইকোর্টে সেই অভিযোগের পক্ষে কোনও জোরালো প্রমাণ দেখাতে পারেনি রাজ্য। বরং পেশ করা ভিডিয়োগুলিতে আকৃতিকে শ্রমিকদের বেতন এবং কাজের সময় নিয়ে দাবি জানাতেই দেখা গিয়েছে।

এই মামলায় আদালত আরও একবার স্পষ্ট করেছে, নিজের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। শুধুমাত্র ‘শান্তিভঙ্গ হতে পারে’—এই আশঙ্কার ভিত্তিতে মানুষকে প্রকাশ্যে জড়ো হওয়া বা নিজেদের দাবি জানানো থেকে আটকানো যায় না।

তবে NSA-র আটকাদেশ বাতিল হলেও আকৃতি এখনও অন্য ফৌজদারি মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। ওই মামলাগুলিতে তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ হাই কোর্ট NSA-র মাধ্যমে তাঁর আটককে অবৈধ বললেও, অন্যান্য মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *