বিপদ কি শুধুই বৃষ্টিতে, প্রশ্ন তুলছে নিউ ফরাক্কায় ধ্বস - 24 Ghanta Bangla News
Home

বিপদ কি শুধুই বৃষ্টিতে, প্রশ্ন তুলছে নিউ ফরাক্কায় ধ্বস

Spread the love

কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

অতিবৃষ্টির পরে নিউ ফরাক্কা জংশন সংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ মাটি বসে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে। আপাত ভাবে স্থানীয় ভূমি অবনমনের ঘটনা হলেও ফরাক্কা ব্যারাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর কাছে এমন ঘটনা বৃহত্তর ভূ-পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এখনই একে ব্যারাজের বিপদের সরাসরি পূর্বাভাস বলা যাবে না। তবে কারণ খুঁজতে গঙ্গার প্রবাহ, পলি পরিবহণ, ভূগর্ভস্থ জলের চাপ এবং ব্যারাজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব একসঙ্গে খতিয়ে দেখা জরুরি।

ফরাক্কা শুধু একটি ব্যারাজ নয়। গঙ্গার মূল প্রবাহ, পলি সঞ্চয় ও ক্ষয়, নদীতীর ভাঙন, চর, ফিডার ক্যানাল, ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ জলাধার মিলিয়ে এটি জটিল নদী ও জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং অঞ্চল। পললভূমির নীচে বালি ও কাদার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কোথাও পুরোনো নদীখাতও চাপা পড়ে থাকতে পারে। ভূগর্ভস্থ জলের চাপের পরিবর্তন, অতিরিক্ত জল উত্তোলন, বৃষ্টির জল মাটিতে প্রবেশ, পলির সঙ্কোচন বা ভারী পরিকাঠামোর চাপে স্তরগুলির পুনর্বিন্যাস হতে পারে। তার ফল হতে পারে ‘ল্যান্ড সাবসিডেন্স’ বা ভূমির বসে যাওয়া।

জিওমর্ফোলজিস্ট (ভূমিরূপ বিশেষজ্ঞ) সুজীব কর বলেন, ‘সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মাটির নীচের জলচাপের পরিবর্তন সম্ভব। ফলে নিউ ফরাক্কায় ঠিক কোন স্তরে কী পরিবর্তন হয়েছে, তা জানতে ভূগর্ভের মাটির গঠন এবং জলস্তর পরীক্ষা করা প্রয়োজন।’

একই সঙ্গে উঠছে ফরাক্কা ব্যারাজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের পুরোনো প্রশ্ন। বদ্বীপকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান নদীর বয়ে আনা পলি। তা জমে ভূমির উচ্চতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসাম্য তৈরি করে। কিন্তু ব্যারাজের উজানে বিপুল পলি আটকে গেলে ভাটিতে তার পৌঁছনো কমে যায়। ফলে বদ্বীপে পলি সঞ্চয় কমে গিয়ে ভূমি অবনমন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (জিবিএম) বদ্বীপ প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাসের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৬৮ থেকে ২০১২–এর মধ্যে এই অঞ্চলে জলস্তর বছরে গড়ে প্রায় ৩ মিলিমিটার বেড়েছে, বিশ্বে গড় বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২ মিলিমিটার। সাম্প্রতিক গবেষণায় শতাব্দীর শেষে এই অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৮৫ থেকে ১৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হয়েছে।

এর সঙ্গে ভবিষ্যতের উদ্বেগ জাতীয় নদী সংযোগ প্রকল্প। প্রায় ৯,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের মাধ্যমে ৪৪টি নদী যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এর ফলে গঙ্গায় পলি পরিবহণ ৩৯ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং ব্রহ্মপুত্রে ৯ থেকে ২৫ শতাংশ কমতে পারে। বদ্বীপে বার্ষিক পলি সঞ্চয় ৩.৬ মিলিমিটার থেকে কমে প্রায় ২.৫ মিলিমিটারে নামতে পারে।

প্রতীকী ছবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর জলপ্রবাহ ও পলি পরিবহণের সম্পর্ক সরল নয়। জলপ্রবাহ সামান্য কমলেও পলি পরিবহণ অনেক বেশি হারে কমতে পারে। এমনকী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের জলপ্রবাহ ১০ শতাংশ কমলে বদ্বীপে পলি পৌঁছনোর পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমার আশঙ্কা রয়েছে। ফরাক্কায় পলি আটকে যাওয়ার প্রেক্ষিতে নদী সংযোগ প্রকল্প হলে বদ্বীপের অবনমন আরও তীব্র হতে পারে।

নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতীম কর্মকার বলছেন, ‘বিপুল পরিমাণে ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের ফলে জলের স্তর সঙ্কুচিত হয়ে মাটি বসে যায়। ইঁদুরের মতো মাটির নীচে বসবাসকারী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করায় বিভিন্ন নির্মাণের ভূগর্ভস্থ অংশও ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভূমিধ্বস ঘটাতে পারে।’ তাই নিউ ফরাক্কার ঘটনা সব দিক থেকেই সতর্কবার্তা।

তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, গোটা এলাকায় নদীর তলদেশের উচ্চতা ও পলি পরিবহণের নিয়মিত হিসেব এবং দীর্ঘমেয়াদি স্যাটেলাইট নজরদারি প্রয়োজন। ইন্টারফেরোমেট্রিক সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার (ইনসার) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্ষার আগে ও পরে ভূমির সূক্ষ্মতম পরিবর্তন পরীক্ষা করাও অবশ্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *