ফের ‘ভুল হিসাবের’ আশঙ্কা! পাকিস্তানের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে সতর্ক অনিল চৌহান
নয়াদিল্লি: পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ইসলামাবাদের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। এর ফলে পাকিস্তান ফের কোনও ‘ভুল হিসাব’ করে বসতে পারে বলে সতর্ক করলেন ভারতের প্রাক্তন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান।
শনিবার নয়াদিল্লির তিনমূর্তি ভবন কমপ্লেক্সে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তান আগামী দিনেও ভারতের জন্য বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং হুমকি হয়ে থাকবে। একইসঙ্গে প্রতিবেশী দেশটির সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সমঝোতাগুলির প্রভাব নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে সতর্কবার্তা
অনিল চৌহানের বক্তব্য এসেছে ৭ অগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের প্রায় এক মাস পর। এই চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের মধ্যে কোনও একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই চুক্তির ফলে পাকিস্তানের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন প্রাক্তন CDS। তাঁর কথায়, সাম্প্রতিক এই ধরনের চুক্তি পাকিস্তানের মধ্যে ‘ওভারকনফিডেন্স’ তৈরি করতে পারে এবং তার জেরে তারা ফের কোনও ভুল হিসাব করে ফেলতে পারে। তাই ভারতকে সতর্ক থাকতে হবে।
Advertisements
‘পাকিস্তান আগামী দিনেও বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ’
‘ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি ও চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ে ২২তম ভারতরত্ন পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থ মেমোরিয়াল লেকচারে বক্তব্য রাখেন অনিল চৌহান। ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, একাধিক বিষয় দেশের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। এর মধ্যে রয়েছে অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ, নন-স্টেট অ্যাক্টর এবং মহাকাশ, সাইবার ও সামুদ্রিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা। পাকিস্তান প্রসঙ্গে তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, “পাকিস্তান আগামী দিনেও বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং হুমকি হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেন, অপারেশন সিঁদুর, সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখা এবং অন্যান্য বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের পক্ষ থেকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে, যাতে প্রতিবেশী দেশের আচরণে পরিবর্তন আসে।
সন্ত্রাসবাদ ও ‘প্রক্সি ওয়ার’ নিয়ে কড়া বার্তা
পাকিস্তানের কৌশল নিয়ে বলতে গিয়ে অনিল চৌহান সন্ত্রাসবাদ এবং ‘প্রক্সি ওয়ার’-কে ভারতের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধের পরিসর কিছুটা সীমিত হয়েছে। একইসঙ্গে এর ফলে নীচের স্তরে সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্তপারের কার্যকলাপের মতো ‘সাব-কনভেনশনাল অপারেশন’-এর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিকে তিনি ‘স্ট্যাবিলিটি-ইনস্ট্যাবিলিটি প্যারাডক্স’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ, পারমাণবিক স্তরে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি হলেও তার নীচের স্তরে অস্থিরতা বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, নন-স্টেট অ্যাক্টরদের ব্যবহার করলে কোনও রাষ্ট্র সরাসরি দায় অস্বীকার করার সুযোগ পায় এবং এই ধরনের অভিযানের দৃশ্যমান খরচও কমে যায়। অন্যদিকে, আদর্শগত প্রচার, নিয়োগ, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার মাধ্যমে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ফের সক্রিয় করা সম্ভব।
‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে’
অনিল চৌহানের মতে, সন্ত্রাসবাদ এবং প্রক্সি যুদ্ধ ভারতের সামনে আগামী দিনেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। এর মোকাবিলায় প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তিনি উদাহরণ হিসেবে উরি, বালাকোট এবং অপারেশন সিঁদুরের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছে প্রক্সি যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদ চালানোর খরচ বাড়াতে হবে, যাতে ইসলামাবাদ এগুলিকে ‘রাষ্ট্রীয় নীতির হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকে।
অপারেশন সিঁদুরের সময় অনিল চৌহান চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৬ সালের মে মাসে অবসর নেওয়ার পরও তিনি বলেছেন, অপারেশন সিঁদুর শেষ হয়নি, বরং আপাতত বিরতিতে রয়েছে। তাই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে সবসময় অপারেশনাল প্রস্তুতি বজায় রাখতে হবে বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
ভবিষ্যতের যুদ্ধে প্রযুক্তিই বদলে দেবে কৌশল
অনিল চৌহান ভবিষ্যতের যুদ্ধের চরিত্র নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, আগামী দিনে যে বাহিনী প্রতিপক্ষের তুলনায় দ্রুত শিখতে এবং নিজেদের পরিবর্তন করতে পারবে, তারাই বেশি সুবিধা পাবে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম, কগনিটিভ এবং সিন্থেটিক ডোমেনেও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে জয়েন্টনেস ও ইন্টিগ্রেশন-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি আমলাতন্ত্রের তুলনায় দ্রুত সাংগঠনিক সীমারেখা মুছে দিচ্ছে। তাই সেন্সর, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং অস্ত্র ব্যবস্থাকে সমস্ত ডোমেনে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করতে হবে।
অপারেশন সিঁদুরে উন্নত ব্যাটলফিল্ড ট্রান্সপারেন্সি এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়ার ক্ষমতা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতের সামরিক অভিযানে একটি কমন অপারেশনাল পিকচার এবং শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে জানান প্রাক্তন CDS।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন