কৃষিতে কমছে তরুণদের আগ্রহ, ভবিষ্যতে ভারতের খাবার ফলাবেন কারা?
কলকাতা: ভারতের খাদ্য (Indian Agriculture) নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত কয়েকটি প্রশ্নই সামনে আসে। দেশে কতটা খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে? খাদ্যশস্যের মজুত পর্যাপ্ত কি না? আগামী মরশুমে বর্ষা কেমন হবে? কিন্তু এর পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে: ভবিষ্যতে ভারতের খাবার ফলাবেন কারা?
ভারত বিশ্বের অন্যতম তরুণ বড় অর্থনীতি। দেশের মানুষের গড় বয়স বা median age প্রায় ২৯ বছর। অথচ কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষের বয়স তার তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় ভারতীয় কৃষকদের গড় বয়স প্রায় ৫০-৫৫ বছর বলে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, একদিকে তরুণ জনসংখ্যার দেশ ভারত, অন্যদিকে দেশের খাদ্য উৎপাদন ক্রমশ নির্ভর করছে বয়স্ক কৃষি-শ্রমশক্তির উপর। এখনই এর প্রভাব খাদ্য উৎপাদনে বড় আকারে দেখা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ভারতের খাদ্য ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
কৃষিকে পেশা হিসেবে নিতে চাইছেন না তরুণরা
ভারতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কৃষিকাজ বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের হাতে এসেছে। কৃষি শুধু পেশা ছিল না, ছিল জীবনযাপনের অংশ। কিন্তু সেই প্রজন্মগত ধারাবাহিকতা এখন দুর্বল হচ্ছে। গ্রামের তরুণরা ক্রমশ শহর, নিয়মিত চাকরি এবং কৃষির বাইরের পেশার দিকে ঝুঁকছেন। এর কারণও স্পষ্ট। কৃষি নির্ভর করে আবহাওয়া, বাজারদর, উৎপাদন খরচ এবং জমির আকারের মতো একাধিক অনিশ্চিত বিষয়ের উপর।
Advertisements
একজন তরুণ যখন নিজের কর্মজীবন শুরু করার কথা ভাবছেন, তখন প্রচলিত কৃষিকাজ তাঁর কাছে অনেক সময় সম্ভাবনার বদলে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বলে মনে হতে পারে। গ্রামীণ যুবসমাজের কৃষি-সম্পর্কিত আকাঙ্ক্ষার একটি গবেষণায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। Down To Earth-এ আলোচিত ওই গবেষণা অনুযায়ী, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া গ্রামীণ তরুণদের মাত্র ১.২ শতাংশ ভবিষ্যতে কৃষক হতে চেয়েছিলেন। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যে দেশে এখনও লক্ষ লক্ষ কৃষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট উদ্বেগের।
গ্রাম ছাড়া অনেকের কাছেই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত
তরুণদের শহরমুখী হওয়াকে শুধু গ্রামীণ সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি আসলে একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। কৃষিতে আয় অনিশ্চিত হলে এবং শহরে নিয়মিত বেতনের চাকরির সম্ভাবনা থাকলে তরুণদের অন্য পেশার দিকে যাওয়া স্বাভাবিক। গ্রামীণ যুবসমাজের অভিবাসন নিয়ে গবেষণাতেও কৃষির কম লাভজনকতা, উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা এবং অপর্যাপ্ত আয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি গবেষণায় ৬৭.৪৩ শতাংশ তরুণ কৃষি থেকে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সংগঠিত বাজারের অভাবে লাভজনক দাম না পাওয়াকে উল্লেখ করেছিলেন।
ছোট জমিও বড় বাধা
ভারতীয় কৃষির কাঠামোগত সমস্যাও তরুণদের কৃষিতে ধরে রাখা কঠিন করে তুলছে। National Statistical Office-এর Situation Assessment Survey of Agricultural Households অনুযায়ী, দেশের ৭০.৪ শতাংশ কৃষি পরিবার এক হেক্টরের কম জমি চাষ করে।
এত ছোট জমিতে বড় আকারে বিনিয়োগ করা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খরচ কমানো কিংবা উৎপাদন ও বাজারদরের ধাক্কা সামলানো কঠিন। ফলে কোনও তরুণের হাতে যদি ছোট ও খণ্ডিত জমি উত্তরাধিকারসূত্রে আসে, সেটিকে সবসময় আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে দেখা নাও হতে পারে।
কৃষকের আয় বাড়লেও প্রশ্ন থাকছে
কৃষি পরিবারের গড় মাসিক আয় অবশ্য সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ২০১২-১৩ সালে ₹৬,৪২৬ থেকে ২০১৮-১৯ সালে তা বেড়ে ১০,২১৮ টাকা হয়েছে। এই বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সময়ে ভারতের non-farm economy দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে তরুণরা যখন কৃষি থেকে পাওয়া অনিশ্চিত আয়ের সঙ্গে অন্য পেশার তুলনা করছেন, তখন নিয়মিত এবং তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য আয়ের সুযোগ তাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। সমস্যাটি তাই শুধু কৃষকদের বয়স বাড়ছে, এমন নয়।
বয়স্ক কৃষকের বহু বছরের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। মাটি, আবহাওয়া, ফসল, পশুপালন এবং স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থার বিষয়ে সেই জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আসল প্রশ্ন হল, এই জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছবে কীভাবে, যদি তরুণরা কৃষিকাজ গ্রহণই না করেন?
কৃষিতে শ্রমিকের ঘাটতি বাড়তে পারে
কৃষির কর্মশক্তি ক্রমশ বয়স্ক হয়ে গেলে ভবিষ্যতে একাধিক পরিবর্তন হতে পারে। শ্রমিকের ঘাটতি বাড়তে পারে। কৃষিতে যন্ত্রের উপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। ফসলের ধরন বদলাতে পারে। ছোট জমি ইজারা দেওয়া বা একত্রিত করার প্রবণতা বাড়তে পারে। আবার যেখানে কৃষিকাজ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, সেখানে জমি অনাবাদিও থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে উদ্যানপালন ও পশুপালনের মতো শ্রমনির্ভর ক্ষেত্র এর প্রভাব অনুভব করতে পারে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের আয় বা গ্রামীণ জীবনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যের প্রাপ্যতা, দাম এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে খাদ্য রাখার ক্ষমতার উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তার নতুন প্রশ্ন
খাদ্য নিরাপত্তাকে সাধারণত খাদ্যের প্রাপ্যতা, মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য পাওয়ার সুযোগ দিয়ে বিচার করা হয়। কিন্তু প্রতিটি টন চাল-গম, প্রতি লিটার দুধ এবং প্রতিটি কেজি সবজির পিছনে রয়েছেন একজন কৃষক এবং একটি কৃষি-শ্রমশক্তি। ভারত সেচ, উন্নত বীজ, সার, কৃষি গবেষণা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যতই বিনিয়োগ করুক, শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদনের জন্য মানুষ প্রয়োজন। এখানেই ভারতের demographic dividend-এর সঙ্গে কৃষির বর্তমান পরিস্থিতির বৈপরীত্য সবচেয়ে স্পষ্ট। দেশে বিপুল তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে, অথচ কৃষি সেই প্রজন্মকেই যথেষ্ট আকর্ষণ করতে পারছে না।
ভবিষ্যতের কৃষক কেমন হবেন?
এর সমাধান অবশ্যই প্রতিটি তরুণকে গ্রামে ফিরিয়ে এনে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করানো নয়। বরং কৃষিকে এমন একটি আধুনিক ও লাভজনক ecosystem হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৃষির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একাধিক পথ থাকবে।
কেউ হয়তো ছোট জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করতে চাইবেন না। কিন্তু সেই তরুণই precision farming, কৃষি যন্ত্র পরিষেবা, dairy unit, food processing, storage, agri-logistics অথবা digital agricultural service-এর ব্যবসা করতে আগ্রহী হতে পারেন।
এই জায়গায় Indian Council of Agricultural Research-এর Attracting and Retaining Youth in Agriculture programme-এর মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি ও allied sector-এ গ্রামীণ তরুণদের উদ্যোগী হওয়ার সুযোগ তৈরি করাই এই ধরনের কর্মসূচির মূল ভাবনা। তবে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন ঋণ, বাজার, প্রযুক্তি, পরিকাঠামো, দক্ষতা এবং নির্ভরযোগ্য value chain।
কৃষিকে হতে হবে সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তরুণদের কাছে কৃষিকে এমন একটি পেশা হিসেবে তুলে ধরতে হবে যেখানে সম্মান, আয় এবং উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষক হওয়ার অর্থ যেন সমৃদ্ধির সম্ভাবনা ছেড়ে দেওয়া না হয়। ভারতের কৃষিনীতি এতদিন মূলত উৎপাদন বাড়ানো, কৃষকদের বাজারদরের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। এগুলি ভবিষ্যতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু এখন এর সঙ্গে যোগ করতে হবে আরও একটি বিষয়, প্রজন্মগত স্থায়িত্ব।
সবুজ বিপ্লবের পর নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ শতকের ভারতের অন্যতম বড় প্রশ্ন ছিল, দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য কীভাবে উৎপাদন করা যায়। Green Revolution সেই প্রশ্নের একটি বড় উত্তর দিয়েছিল। কিন্তু একবিংশ শতকের কৃষি সমস্যাটি আরও জটিল। ভারতকে একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা, ছোট ও খণ্ডিত জমি এবং পরিবর্তিত ভোক্তা চাহিদার সঙ্গে লড়তে হবে।
আর এই সব সমস্যার পিছনে রয়েছে একটি মৌলিক মানবিক প্রশ্ন: পর্যাপ্ত তরুণ কি কৃষিকে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নেবেন? কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের তরুণদের কাছে চাষাবাদকে রোম্যান্টিক করে তুলে ধরার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত ও লাভজনক পেশা করে তোলা।
কারণ ভবিষ্যতের ভারতীয় কৃষি শুধু উন্নত বীজ, স্মার্ট যন্ত্র বা জলবায়ু-সহনশীল ফসলের উপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে একজন তরুণ ভারতীয় কৃষিজমির দিকে তাকিয়ে সেখানে নিজের জন্য একটি ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন কি না, তার উপর। আর তাই আগামী কয়েক দশকের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো এটা নয়, ভারত কতটা খাদ্য উৎপাদন করবে? প্রশ্নটা আরও মৌলিক: “সেই খাবার ফলাবেন কারা?”