অটো যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের কাছে ৯৮,০০০ কোটির মজুত পণ্য পড়ে আছে: প্রতিবেদন
মুম্বই: ভারতের অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট শিল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ ইনভেন্টরিতে আটকে রয়েছে। ভেক্টর কনসাল্টিং গ্রুপের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের অটো কম্পোনেন্ট সংস্থাগুলির প্রায় ৯৮,০০০ কোটি টাকা…
মুম্বই: ভারতের অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট শিল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ ইনভেন্টরিতে আটকে রয়েছে। ভেক্টর কনসাল্টিং গ্রুপের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের অটো কম্পোনেন্ট সংস্থাগুলির প্রায় ৯৮,০০০ কোটি টাকা ইনভেন্টরিতে আটকে রয়েছে। উন্নত ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট বা মজুত ব্যবস্থাপনা করা গেলে এর মধ্যে প্রায় ২৯,০০০-৩৯,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ আবার ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
এর মধ্যে প্রায় ৪,০০০-৫,৬০০ কোটি টাকা অর্থ ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই ক্ষেত্র থেকে মুক্ত করা সম্ভব বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের মোট অটো কম্পোনেন্ট নির্মাতাদের প্রায় ৮০ শতাংশই এমএসএমই।
ইনভেন্টরি কমলেই ফিরবে বড় অঙ্কের কার্যকরী মূলধন
ভেক্টর কনসাল্টিং গ্রুপের শ্বেতপত্র ‘দ্য ব্রোকেন ফ্লাইহুইল: বিল্ডিং আ ফিউচার-রেডি অটোমোটিভ সাপ্লাই ইকোসিস্টেম’-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থার বাস্তবায়ন-অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, যেসব সংস্থা কনজাম্পশন-বেসড রিপ্লেনিশমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে, তারা সাধারণত ইনভেন্টরি প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ মজুত না রেখে প্রকৃত ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ ও পুনরায় মজুতের ব্যবস্থা করলে সংস্থাগুলির বিপুল পরিমাণ কার্যকরী মূলধন আটকে থাকার সমস্যা কমতে পারে। এই গবেষণায় ২১ জন সিনিয়র শিল্পকর্তার মতামত নেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে।
আরও পড়ুন: খরচ প্রায় ৫০ হাজার কোটি! আরও ৫ S-4০০ কেনার আরও কাছে মোদী সরকার
Advertisements
এমএসএমইগুলির উৎপাদনশীলতা বাড়লে অতিরিক্ত ৮৮,০০০ কোটি টাকা ব্যবসা হতে পারে
রিপোর্টে ভারতের অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট শিল্পের এমএসএমইগুলির মোট বার্ষিক টার্নওভার আনুমানিক ২.৪-২.৯ লাখ টাকা কোটি বলে হিসাব করা হয়েছে। এই সংস্থাগুলির উৎপাদনশীলতা যদি মাত্র ৩০ শতাংশ বাড়ানো যায়, তাহলে বছরে অতিরিক্ত ৭৪,০০০-৮৮,০০০ কোটি টাকা টার্নওভার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপকরণের খরচ বাদ দেওয়ার পর এর থেকে আনুমানিক ২৯,০০০-৪৪,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মূল্য তৈরি হতে পারে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে শিল্পে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিনিয়োগ চক্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপারেশনাল দক্ষতা বাড়লে আটকে থাকা কার্যকরী মূলধন মুক্ত হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়লে নিয়মিত উদ্বৃত্ত তৈরি হবে এবং সরবরাহকারীদের আর্থিক সক্ষমতা উন্নত হলে বাইরের মূলধন পাওয়াও সহজ হতে পারে।
আরও পড়ুন: গঙ্গাকে কেন্দ্র করে বড় প্রকল্পের পথে বাংলার ডবল ইঞ্জিন! অনুমোদন ৫০০ কোটির
প্রযুক্তি ও পণ্য উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ
এই অতিরিক্ত অর্থ পরে প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, পণ্য উন্নয়ন এবং উন্নত উৎপাদন ক্ষমতা তৈরিতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এর ফলে ভারতীয় অটো কম্পোনেন্ট সংস্থাগুলি ভবিষ্যতে অটোমোবাইল শিল্পের আরও বেশি মূল্য সংযোজনকারী বিভাগে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। ভেক্টরের গবেষণাটি অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া বা এসিএমএ-র ৬৬তম বার্ষিক অধিবেশনে প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিল্পকর্তাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মনে করেন, ভবিষ্যতের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরিতে এমএসএমইগুলি যথেষ্ট দ্রুত বিনিয়োগ করছে না।
কারখানায় সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন কম
রিপোর্টে অটো কম্পোনেন্ট শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাপাসিটি প্যারাডক্স বা সক্ষমতার বৈপরীত্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন কারখানা গড়ে প্রায় ৭৫-৮৫ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করছে। অথচ সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯১ শতাংশ শিল্পকর্তা সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন। এর কারণ হিসেবে বারবার উৎপাদন লাইন পরিবর্তন, গুণমানজনিত ক্ষতি, পুনরায় কাজ করা বা রিওয়ার্ক এবং উপকরণের দুর্বল প্রবাহের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কারখানায় যন্ত্রপাতি ও ইনস্টলড ক্যাপাসিটি থাকলেও তার পুরোটাকে কার্যকর উৎপাদনে পরিণত করা যাচ্ছে না।
ভেক্টর কনসাল্টিং গ্রুপের ম্যানেজিং পার্টনার রবীন্দ্র পাটকি বলেন, সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র নতুন উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করা নয়। ভারতীয় সংস্থাগুলির ইতিমধ্যেই থাকা সক্ষমতার একটি বড় অংশকে কার্যকর উৎপাদনে রূপান্তর করা সম্ভব।
তাঁর মতে, অপারেশনে আটকে থাকা নগদ অর্থ মুক্ত করা, বিদ্যমান ব্যবসার অর্থনৈতিক কার্যকারিতা বাড়ানো এবং সেই উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে নতুন সক্ষমতা তৈরি করাই ভবিষ্যতের অটোমোটিভ ভ্যালু চেনে ভারতীয় সরবরাহকারীদের বৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি।
আরও পড়ুন: আদানির পর এবার টাটা কেমিক্যালসকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিল কেনিয়া
ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক্সে বদলাচ্ছে গাড়ির মূল্য
ভারতের অটোমোটিভ শিল্পে সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ গাড়ির মোট মূল্যের একটি বড় অংশ ক্রমশ ব্যাটারি, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স, এমবেডেড সফটওয়্যার এবং ইন্টিগ্রেটেড ইলেকট্রনিক সিস্টেমের দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে শুধু প্রচলিত যন্ত্রাংশ তৈরি করলেই ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। ভারতের সামনে একই সঙ্গে দেশীয় লোকালাইজেশন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছ থেকে আরও বেশি গ্লোবাল সোর্সিংয়ের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে ভারতীয় সাপ্লায়ার ইকোসিস্টেমকে নিয়মিতভাবে নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ করার মতো উদ্বৃত্ত তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ ৯৮,০০০ কোটি টাকা ইনভেন্টরিতে আটকে থাকা অর্থ শুধু একটি আর্থিক সমস্যা নয়, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির জন্য সেটিই ভারতের অটো কম্পোনেন্ট শিল্পের বড় সম্ভাব্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।