তিস্তা প্রকল্প থেকে জে-১০সিই, চিনের সঙ্গে বড় চুক্তির পথে বাংলাদেশ
নয়াদিল্লি: চিনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ (Bangladesh China deal)। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প থেকে শুরু…
নয়াদিল্লি: চিনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ (Bangladesh China deal)। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প থেকে শুরু করে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেোনার সম্ভাবনা, দুই দেশের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকায় চিনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
চিনকে ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ বলল বাংলাদেশ
বৈঠকে হুমায়ুন কবীর চিনকে বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত বন্ধু এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ওয়ান-চায়না নীতির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চিন সফরের পর বাংলাদেশ-চিন সম্পর্ক নতুন গতি পেয়েছে বলেও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। দুই দেশের সম্পর্ককে ‘চিন-বাংলাদেশ শেয়ার্ড ফিউচার কমিউনিটি’ বা অভিন্ন ভবিষ্যতের চিন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়ের পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
আরও পড়ুন: অভিযুক্ত দুই যুবকের রক্তে নেই মাদকের অস্তিত্ব! রংপুর হিন্দু খুনে নয়া মোড়
৫০০ মিলিয়ন ডলারের চিনা বিনিয়োগ
প্রধানমন্ত্রীর চিন সফরের সময় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে রয়েছে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বা সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণের জন্য বাণিজ্যিক চুক্তি। সিইআইজেডে প্রায় ৩০টি চিনা সংস্থা বিনিয়োগ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। এই শিল্পাঞ্চলের মাধ্যমে স্থানীয় বাংলাদেশিদের জন্য আনুমানিক ১,০০,০০০ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। মোংলায় একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেড গড়ে তোলার সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করেছে।
আরও পড়ুন: ফুঁসছে ভোতে কোশী, নেপালে ফের জারি বন্যা সতর্কতা! মৃত্যুমিছিল ৯০০ পার
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা
বৈঠকে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া দ্রুত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ শুরু করার বিষয়টি উঠে আসে। একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সংলাপ শুরু করার বিষয়েও দুই দেশ আলোচনা করেছে। বাংলাদেশ থেকে চিনে কাঁঠাল ও পেয়ারা রপ্তানি শুরু করার প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর পাশাপাশি চিন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর এবং রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও দুই পক্ষ মতবিনিময় করেছে।
বাংলাদেশ সফরে আসছেন চিনের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা
চিনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সফরে আসতে পারেন এমন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ চিনা কর্মকর্তার সফর নিয়েও আলোচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছেন চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন এজেন্সি বা সিআইডিসিএ-র ভাইস প্রেসিডেন্ট, চিনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী এবং ইউনান প্রদেশের এক্সিকিউটিভ ভাইস গভর্নর। এছাড়া চিনের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীরকে অক্টোবরে চিন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: এসসিও সামিটের মাঝেই বৈঠক! মুখোমুখি মোদী ও ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান
জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পথে বাংলাদেশ?
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও চিনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশি সরকারের একটি প্যানেল চিনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন সফরের সময়ও বাংলাদেশি বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত সপ্তাহে এক সরকারি ব্রিফিংয়ে জানান, বিমানবাহিনী আধুনিকীকরণের জন্য বিভিন্ন ধরনের চতুর্থ প্রজন্মের এমআরসিএ বা মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট, যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে।
জে-১০সি নিয়ে খসড়া চুক্তি
জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, এমআরসিএ জে-১০সি এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার নিয়ে একটি কমিটি পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে খসড়া চুক্তি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, চলতি অর্থবর্ষে বাজেট সহায়তা পাওয়া গেলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী বাজেটে বিষয়টি নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত চুক্তির পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে আলোচনা এগিয়েছে।
কেন জে-১০সিই-তে আগ্রহ বাংলাদেশের?
জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, চিনের তৈরি বহুমুখী যুদ্ধবিমানগুলির মধ্যে জে-১০সি বর্তমানে অন্যতম আধুনিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি জে-১০সিকে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এর পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চিনা যুদ্ধবিমানের দিকে নজর দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ইউরোপীয় সমমানের যুদ্ধবিমানের তুলনায় তুলনামূলক কম দামকেও তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, রাফাল বা ইউরোফাইটার টাইফুনের মতো ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানের তুলনায় চিনা যুদ্ধবিমানের দাম তুলনামূলকভাবে কম। তবে জে-১০সিই কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, কতগুলি বিমান কেনা হবে এবং চুক্তির আর্থিক শর্ত এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করার ইঙ্গিত
তিস্তা প্রকল্প, মোংলা বন্দর, শিল্পাঞ্চল, কৃষিপণ্য রপ্তানি এবং অর্থনৈতিক করিডরের পাশাপাশি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে আলোচনার ফলে বাংলাদেশ-চিন সম্পর্কের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। একদিকে চিন বাংলাদেশে শিল্প ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকীকরণের জন্য চিনা সামরিক প্রযুক্তির দিকে নজর দিচ্ছে। এখন নজর থাকবে তিস্তা প্রকল্পের পরবর্তী পদক্ষেপ, দুই দেশের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য চুক্তি কতটা এগোয় তার দিকে।