মেয়াদ ফুরোচ্ছে ২০২৬-এ! ফরাক্কা চুক্তি নিয়ে ঢাকা-বিহার-বাংলার ত্রিমুখী চাপে কেন্দ্র
কলকাতা: একসময় বঙ্গোপসাগর থেকে রুপোলি ইলিশ সোজা পৌঁছে যেত এলাহাবাদের সঙ্গমে! শুনতে অবাক লাগলেও, ১৯৭৫ সালের আগে এটাই ছিল বাস্তব। কিন্তু গঙ্গার বুকে ফরাক্কা ব্যারেজ…
কলকাতা: একসময় বঙ্গোপসাগর থেকে রুপোলি ইলিশ সোজা পৌঁছে যেত এলাহাবাদের সঙ্গমে! শুনতে অবাক লাগলেও, ১৯৭৫ সালের আগে এটাই ছিল বাস্তব। কিন্তু গঙ্গার বুকে ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরি হওয়ার পর ইলিশের সেই উজানের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। সেই ফরাক্কা ব্যারেজ নিয়েই আজ ফের এক মহা-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬ সালে শেষ হতে চলেছে ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ‘গঙ্গা জলচুক্তি’। আর এই চুক্তি নবীকরণের আগেই ঢাকা, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের ত্রিমুখী স্বার্থের সংঘাতে প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
মালদহ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করা গঙ্গা ফরাক্কায় এসে দু’ভাগে ভাগ হয়েছে, একটি শাখা ভাগীরথী-হুগলি নামে এ রাজ্যে ঢুকেছে, অন্যটি পদ্মা নামে চলে গিয়েছে বাংলাদেশে। ব্রিটিশ আমলের পরিকল্পনাকে মান্যতা দিয়ে ১৯৭৫ সালে মুর্শিদাবাদে এই ফরাক্কা বাঁধটি নির্মাণ করা হয় মূল একটি কারণেই, গঙ্গার অতিরিক্ত জল ৩৮-৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানালের মাধ্যমে হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা, যাতে পলি ধুয়ে গিয়ে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নাব্যতা বজায় থাকে।
কী বলছে ১৯৯৬ সালের চুক্তি?
ফরাক্কায় জল আটকে রাখায় শুখা মরশুমে বাংলাদেশের পদ্মায় জলস্তর কমতে থাকে, যার প্রভাব পড়ে সে দেশের কৃষি ও মৎস্যচাষে। দীর্ঘ বিবাদের পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবেগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা জলচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ফরাক্কায় জলের প্রাপ্যতা ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান ভাগ পাবে। ৭০-৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক, বাকিটা ভারত। আর ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার রেখে বাকিটা বাংলাদেশকে দেবে।
ঢাকার নতুন দাবি ও রাষ্ট্রসংঘের হুঁশিয়ারি
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ঢাকার সুর এখন বেশ চড়া। বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রী শহিদুদ্দিন চৌধুরী আনি সম্প্রতি ঢাকায় এক সেমিনারে স্পষ্ট জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে নদীর প্রবাহে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তাই নতুন চুক্তিতে শুখা মরশুমে জলের ‘গ্যারান্টি’ অন্তর্ভুক্ত করতে চায় ঢাকা। দাবি না মানলে আন্তর্জাতিক ফোরাম বা রাষ্ট্রসংঘে যাওয়ারও প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছে প্রতিবেশী দেশটি।
বিহারের ক্ষোভ ও বন্যা পরিস্থিতি
ফরাক্কা নিয়ে ক্ষোভের পারদ চড়ছে বিহারেও। তাদের অভিযোগ, ফরাক্কার কারণে গঙ্গার তলদেশে পলি জমে নদীর নাব্যতা কমেছে, যার জেরে প্রতি বছর ভাগলপুর, মুঙ্গের-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যায় ডোবে। ২০১৬ সালে খোদ নীতীশ কুমার দাবি করেছিলেন, বিহারের সমস্যার একমাত্র সমাধান ফরাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলা!
এবারের বন্যা পরিস্থিতিতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। পাটনার একাধিক ঘাট জলমগ্ন। এই আবহে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী সদ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গঙ্গার প্রবাহ স্বাভাবিক করতে ফরাক্কার সমস্ত গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বিহারের নেতাদের অভিযোগ, গ্রীষ্মে বাংলাদেশকে জল ছাড়ার কারণে বিহারে সেচ ও পানীয় জলের তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়।
পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ ও কেন্দ্রের চ্যালেঞ্জ
পশ্চিমবঙ্গের কাছে ফরাক্কার মূল উদ্দেশ্যই হলো কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরকে বাঁচিয়ে রাখা। এখন বাংলাদেশকে আরও বেশি জল দিলে হুগলি নদীতে কি পর্যাপ্ত জল থাকবে? রাজ্যের নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বন্দর ব্যবস্থাকে সচল রাখাই এখন বাংলার কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের আগে ফরাক্কা জলচুক্তি আর নিছক কোনও আন্তর্জাতিক বিষয় নেই। বাংলাদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব দাবি ও পালটা দাবির মধ্যে ভারসাম্য রেখে একটি সুষ্ঠু চুক্তি প্রণয়ন করাই এখন মোদী সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় অ্যাসিড টেস্ট।
বড় সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের! প্রতিটি জেলায় এবার হবে অন্তত একটি করে পর্যটন কেন্দ্র