শিখবিরোধী হিংসায় দোষী সাব্যস্ত ছিলেন, প্রয়াত সেই প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ সজ্জন কুমার
১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী অশান্তি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ সজ্জন কুমারের মৃত্যু। বৃহস্পতিবার দিল্লির তিহাড় জেলে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। পরে সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
জেল সূত্রে জানা গিয়েছে, সজ্জন কুমারের স্বাস্থ্যের আচমকা অবনতি হয়। এর পরে তাঁকে তিহাড় থেকে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছনোর পরে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও বিস্তারিত ভাবে জানানো হয়নি।
১৯৮৪-র অশান্তি মামলায় যাবজ্জীবন
সজ্জন কুমার ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী অশান্তি চলাকালীন একটি হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির একটি আদালত তাঁকে যশবন্ত সিং এবং তাঁর ছেলে তরণদীপ সিংকে হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর দিল্লিতে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। একই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অশান্তির সময়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লি হাইকোর্টও ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার একটি মামলায় সাজ্জন কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। সেই মামলায় দিল্লির পালাম কলোনি এলাকায় পাঁচ জনকে হত্যার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ওই মামলার পর থেকেই তিনি জেলে ছিলেন।
২০২৬ সালেও একটি মামলায় খালাস
তবে সজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে চলা সব মামলায় তাঁর সাজা হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দিল্লির একটি আদালত তাঁকে জনকপুরী ও বিকাশপুরী এলাকায় ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার সময়ে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলা থেকে খালাস দেয়। আদালত জানিয়েছিল, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন।
এই মামলায় ২০২৩ সালের অগস্টে সজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে দাঙ্গা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা ছড়ানোর অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে খুন ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তখনই বাদ দেওয়া হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টে চলছিল শুনানি
যে মামলায় সজ্জন কুমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন, সেই সাজা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনও করেছিলেন তিনি। চলতি বছরে তাঁর আবেদনের দ্রুত শুনানির আবেদন করা হয়। তাঁর আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, তিনি ইতিমধ্যে সাত বছরেরও বেশি সময় জেলে কাটিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিল। তবে সেই আইনি লড়াই শেষ হওয়ার আগেই মৃত্যু হলো প্রাক্তন সাংসদের।
কে ছিলেন সজ্জন কুমার?
সজ্জন কুমার দিল্লির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তিনি লোকসভা সাংসদও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক শিখবিরোধী হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দিল্লিতেই প্রায় ২,৭০০ শিখ নিহত হয়েছিলেন। দেশজুড়ে মৃতের সংখ্যা ছিল আরও বেশি।
এই দাঙ্গায় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তদন্ত ও আইনি লড়াই চলেছে। সজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আদালতে বিচারাধীন ছিল। পরে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT-এর পুনর্তদন্তের মাধ্যমে একাধিক পুরোনো মামলা ফের সক্রিয় হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নথিতেও ১৯৮৪ সালের অশান্তি মামলাগুলির তদন্তে SIT গঠনের উল্লেখ রয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলায় দোষ প্রমাণিত হলেও অন্য কিছু মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। ৮০ বছর বয়সে তিহাড় জেলে তাঁর মৃত্যু সেই দীর্ঘ আইনি অধ্যায়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে সামনে এল।