১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি ইডেনের ভয়াবহ ক্রিকেট দাঙ্গা
যাই হোক ১লা জানুয়ারী সন্ধ্যা থেকে ২রা জানুয়ারী বেলা পর্যন্ত সোর্বাসের দলকে রাজি করান গেলো না টেস্ট ম্যাচ চালিয়ে যাওয়ার জন্য – কলকাতার কপালে তখন চির কলঙ্কের টিকা প্রায় লেগেই গেছে।
সেই সময় শহরের সম্মান বাঁচাতে এগিয়ে এলেন উত্তর কলকাতার এক মানুষ – নাম তাঁর বেরী সর্বাধিকারী, এই টেস্টের ইংরাজি ধারা বিবরণী দেওয়ার জন্য তখন তিনি কলকাতায়।
বেরী জানতেন কলকাতাকে এই অসম্মানের হাত থেকে বাঁচাতে পারে এক কিংবদন্তী মানুষ যিনি সেই সময় কাকতালীয় ভাবে সম্পূর্ণ অন্য কারণে কলকাতায় এসেছেন – তিনি আর কেউ নন বিশ্ব ক্রিকেট দুনিয়ার স্তম্ভ স্যার ফ্র্যাঙ্ক ওরেল। স্যার ওরেল তখন ওয়েস্ট ইন্ডিসের একটি বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হয়ে ভারতীয় বিশ্ব বিদ্যালয় গ্র্যান্ট কমিশনের দ্বারা আমন্ত্রিত হয়ে ভারতে এসেছেন এবং সেই সময় কলকাতায় তাঁর কলকাতা, যাদবপুর ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভাষণ দেওয়ার কথা।
স্যার ওরেলের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ককে মূলধন করে বেরী সোজা হাজির হলেন তাঁর হোটেলের ঘরে – গ্রেট ইস্টার্নের সাত তলায়। খুব সম্ভবত সেদিন বেরী সর্বাধিকারীর সঙ্গে ছিলেন জিমখানা ক্লাবের দিলীপ ঘোষ। শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর “ক্যাবিবিয়ানের কড়চা” বইতে সেদিনের কথা বার্তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রাঞ্জল বর্ণনা দিয়েছেন মূলত বেরীর লেখা স্মৃতিকথা থেকে। স্যার ওরেল নাকি আলোচনার শুরুতেই বলেছিলেন যে এবার এম, সি, সি এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ড বলতেই পারে যে দল পাঠানোর জন্য ভারত একটি অনুপযুক্ত দেশ।
বেরী সর্বাধিকারী লিখেছেন, “…. ওরেলের যুদ্ধং দেহি ভাব …. শান্ত অথচ কড়া গলায় তিনি একটির পর একটি অভিযোগ পেশ করতে লাগলেন। টেস্ট খেলার আয়োজনে বেবন্দোবস্ত, টিকিট বিক্রিতে দুর্নীতি, টিকিটের কালো বাজারী, জাল টিকিট, পুলিসের বাড়াবাড়ি, ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলোয়াড়দের অসহায় অবস্থায় রেখে কর্তৃপক্ষের সরে পড়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলোয়াড়দের ওপর জনতার আক্রোশ ইত্যাদি ইত্যাদি। – “
স্যার ওরেলের সব কথা স্বীকার করে বেরী একটা কথা পরিষ্কার করে দিলেন বন্ধুর সামনে যে দর্শকদের কোন রাগ কোন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ছিল না – ছিল পুলিস ও সংগঠনের বিরুদ্ধে। স্যার ওরেল ব্যপারটা বুঝেছিলেন।
বেরী এবার তিনটি পয়েন্ট তুলে ধরলেন।
প্রথমতঃ পিচ অক্ষত আছে – ঐ বিপদের মধ্যেও একদল দর্শক কিন্তু পিচ রক্ষা করেছে। দ্বিতীয়তঃ ২রা জানুয়ারী বিশ্রাম মেনে নিয়ে একদিন বাড়িয়ে টেস্টটা বাঁচানো যায় এবং শেষে বেরী উদাহরণ দেন ১৯৫৩ সালে জর্জ টাউনে ক্যারিবিয়ন ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে মাঠে দর্শকরা বিপুল বিক্ষোভ দেখিয়েছিল – ভারত কিন্তু সেই ম্যাচ খেলেছিল।
বন্ধুর দিকে তাকিয়ে দুষ্টু চোখে স্যার ওরেল বলেছিলেন – “ব্ল্যাকমেল করছ বেরী?” এবং তারপরই বলেছিলেন নীতিগত ভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে কিছু বলার কোন অধিকার তাঁর নেই। বেরী তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে তিনি স্যার ফ্র্যাঙ্ক ওরেল – তিনি একবার বললে সোর্বাস, হান্ট অথবা প্রায়র কারোর না বলার কোন ক্ষমতা নেই।
এরপর বেরী লিখেছেন – “ফ্র্যাঙ্কির চোখ দুটি হাসি উপচে পড়ছে … আমি বুঝলাম, কাজ হয়েছে। “
কাজ হয়েছিলো মাত্র দু’ঘণ্টায় – স্যার ওরেলের অনুরোধে গ্যারি সোর্বাসের দল রাজি হয়ে গেলো আবার পরের দিন থেকে ইডেনে খেলতে।
ইতিমধ্যে পুলিস ঘোষণা করে দিয়েছে কিভাবে প্রতিদিন ১০ হাজার দর্শককে কমাবে। প্রথমতঃ দৈনিক ৬ টাকার ৬ হাজার আর ১৫ টাকার আড়াই হাজার টিকিট বিক্রি বন্ধ। ১৫০০ ভেন্ডারের পাস বাতিল। মাঠে জল, চা, কফি, আর কোল্ড ড্রিংক্ ছাড়া অন্য কিছু বিক্রি হবে না – তবে গ্যালারির মাথায় নতুন ত্রিপল লাগানো আর সম্ভব নয়।
এর মধ্যে প্রফুল্ল সেন ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।
কলকাতার সেই টেস্ট দেখতে দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ৩রা জানুয়ারী সব কাজ বাতিল করে ইডেনে খেলা দেখতে উপস্থিত হয়েছিলেন স্বয়ং স্যার ফ্র্যাঙ্ক ওরেল – তিনি তখন কলকাতার নয়নের মনি।
সেই টেস্টে ভারত ইনিংস ও ৪৫ রানে বিশ্রী ভাবে পরাজিত হয়। ৩রা জানুয়ারী ব্যাট করতে নেমে গ্যারি সোর্বাস ৭০ রানের একটি অসামান্য ইনিংস খেলেন।
অন্য দিকে ভারত অধিনায়ক পতৌদি দু’বারই খুব অল্প রানে আউট হন। সারা ইডেনে বিদ্রূপের গুঞ্জন ওঠে কার আকর্ষণে তাঁর প্যাভিলিয়নে ফিরে যাওয়ার এত তাড়া – সেখানে কে অপেক্ষা করছে? এই ইঙ্গিত যে বম্বের এক বাঙালি অভিনেত্রীকে সেটা বলাই বাহুল্য।
দুর্দান্ত নায়কোচিত ব্যাটিং করে দলকে জেতালেও গ্যারি সোর্বাস সেবার অপূর্ণ এক প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলকাতা ছেড়েছিলেন।
দল জেতার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল ত্যাগ করে অন্য একটি হোটেলে চলে যান তিনি – সেখানে নিজের ঘরে ডেকে নেন প্রেমিকা অঞ্জু মহেন্দ্রকে। সেই হোটেলে ৫ই জানুয়ারী কাটিয়ে ৬ই জানুয়ারী ১৯৬৭ দুজনে কলকাতার একটি বিখ্যাত চীনা রেস্তোরায় লাঞ্চ করে সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা করেন যে “ আমরা এনগেজড্” – । যুগান্তর পত্রিকার প্রথম পাতায় ৭ই জানুয়ারী হেড লাইন – “সোর্বাস অঞ্জু শুভ বিবাহ, ঘোষণা”। দুজনের এক সঙ্গে ছবিও সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। একদিন আগে পতৌদির ২৫ বছরের জন্মদিনের পার্টিতে সোর্বাস ঘোষণা করেন তিনি আর অঞ্জু অঙ্গীকার বদ্ধ।
না – স্যার গ্যারি সোর্বাস শেষ পর্যন্ত আর ভারতের জামাই হননি – সেটা অবশ্য অন্য কাহিনী।